Respiratory System

রেসপিরেটরি সিস্টেম

শ্বাসতন্ত্র

হিউম্যান এনাটমি ও ফিজিওলজি
HUMAN ANATOMY & PHYSIOLOGY


সূচিপত্র

রেসপিরেটরি সিস্টেম

শ্বসনকার্য সম্পন্নকারী অঙ্গগুলোকে সম্মিলিতভাবে রেসপিরেটরি সিস্টেম (Respiratory System) বা শ্বসনতন্ত্র বলা হয় ।


রেসপিরেশন (Respiration) বা শ্বাস-প্রশ্বাস শব্দটি দ্বারা মূলত কোষের জন্য অক্সিজেন গ্রহণ ও কোষ হতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিষ্কাশনকে বোঝায়।


রেসপিরেটরি সিস্টেম-এর অংশসমূহ

রেসপিরেটরি সিস্টেম-এর প্রধান দুইটি বিভাগ রয়েছে, যথা:

(ক) আপার রেসপিরেটরি ট্র‍্যাক্ট (Upper Respiratory Tract) বা ঊর্ধ্ব শ্বসনপথ
এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—

১) ন্যাসাল ক্যাভিটি (Nasal Cavity) বা নাসারন্ধ্র ,

২) ন্যাসোফ্যারিনক্স (Nasopharynx) ,

৩) ওরোফ্যারিনক্স (Oropharynx) , এবং

৪) ল্যারিংক্স (Larynx) [ ভোকাল কর্ড (Vocal Cord) পর্যন্ত] ।

(খ) লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র‍্যাক্ট (Lower Respiratory Tract) বা নিম্ন শ্বসনপথ
এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—

১) ল্যারিংক্স (ভোকাল কর্ডের নিচে) ,

২) ট্রাকিয়া (Trachea) ,

৩) প্রিন্সিপাল ব্রংকাস (Principal Bronchus) ,

৪) লোবার ব্রংকাস (Lobar Bronchus) ,

৫) সেগমেন্টাল ব্রংকাস (Segmental Bronchus) ,

৬) টার্মিনাল ব্রংকিওল (Terminal Bronchiole) ,

৭) লোবিউলার ব্রংকিওল (Lobular Bronchiole) ,

৮) রেসপিরেটরি ব্রংকিওল (Respiratory Bronchiole) ,

৯) অ্যালভিওলার ডাক্ট (Alveolar Duct) ,

১০) অ্যাট্রিয়া (Atria) ,

১১) এয়ার স্যাক (Air Sac) ,

১২) অ্যালভিওলাই (Alveoli) ।


প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এর শেষ ভাগ থেকে অ্যালভিওলাস পর্যন্ত অংশ লাঙ (Lung) বা ফুসফুস-এর অভ্যন্তরে অবস্থান করে ।


রেসপিরেটরি সিস্টেম-এর প্রধান অঙ্গসমূহ এবং তাদের ক্রিয়া ও অবস্থান/উল্লেখযোগ্য অংশ

অংশ

অবস্থান

ক্রিয়া/উল্লেখযোগ্য অংশ

নোস (Nose) বা নাসিকা

বাহ্যিক

বায়ু প্রবেশ ও বাহির হওয়ার স্থান

প্যারান্যাসাল সাইনাস

নোস-এর আশপাশ

বায়ুকে উষ্ণ করা

ল্যারিংক্স (Larynx)

ওরাল ক্যাভিটি (মুখ গহ্বর)

লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ ও বাহিরের পথ

ভোকাল কর্ড (Vocal Cord)

গলার সম্মুখে

লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ পথ এবং ধ্বনি তৈরি

ট্রাকিয়া (Trachea)

গলা থেকে বুকের ভিতর পর্যন্ত

লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ ও বাহিরের পথ

ব্রংকাস (Bronchus)

বুকের অভ্যন্তরে

লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ ও বাহিরের পথ

লাঙ (Lung)

বুকের অভ্যন্তরে

অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বিনিময়

দি ডায়াফ্রাম (The Diaphragm)

থোরাক্স ও অ্যাবডোমেন-এর মাঝখানে

শ্বসন কার্য সম্পন্ন করা । থোরাক্স ও অ্যাবডোমেন-এর মধ্যে বিভাজক হিসেবে কাজ করে ।

প্লুরা (Pleura)

লাঙ-এর চারপাশ

লাঙ-কে আবৃত করে রাখা


সূচিপত্রে ফিরে যান

নোস (Nose) বা নাসিকা বা নাক

নোস (Nose) বা নাক বা নাসিকা প্রধানত শ্বসন অঙ্গ । এছাড়াও এটি ঘ্রাণেন্দ্রিয় হিসেবে কাজ করে।


গঠন

নোস-এর দুইটি প্রধান বিভাজন রয়েছে:

(১) এক্সটার্নাল ন্যারিস (External Nares) বা বহিঃনাসিকা: এই অংশটির কঙ্কাল তান্ত্রিক গঠন রয়েছে, যা আংশিক ভাবে বোন (অস্থি) দ্বারা এবং আংশিক কার্টিলেজ (তরুণাস্থি) দ্বারা তৈরি । এর নিম্নলিখিত অংশ রয়েছে:

ক. র‍্যাডিক্স (Radix) বা মূল: নাকের উপরের দিকের অংশ, যা দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে ।

খ. টিপ (Tip) বা পা: নাকের নিচের দিকের উঁচু অংশ ।

গ. ডরসাম (Dorsum): একে ব্রিজও বলা হয় । এই অংশটি নাকের র‍্যাডিক্স ও টিপ-এর মাঝখানে অবস্থান করে ।

ঘ. ন্যাসাল অরিফিস (Nasal Orifice) বা নাসারন্ধ্র: খোলা পথ, যেখান দিয়ে বাতাস নাকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও বের হয় । দুইটি ন্যাসাল অরিফিস রয়েছে— ডান ও বাম।

ঙ. ন্যাসাল সেপ্টাম (Nasal Septum): দুইটি ন্যাসাল অরিফিস-এর মাঝখানে বিদ্যমান বিভাজক । এর বাইরের অংশকে কলামিনা বলা হয় ।

চ. অ্যালা (Alae): এগুলি নাসারন্ধ্র-এর পার্শ্ব দেয়াল ।

(২)  ন্যাসাল ক্যাভিটি বা নাসিকা গহ্বর

(ক) বিস্তার: নাসারন্ধ্র হতে ন্যাসোফ্যারিনক্স পর্যন্ত ।

(খ) অংশ: ন্যাসাল সেপ্টাম দ্বারা নাকের অভ্যন্তরীণ অংশ দুই অংশে বিভক্ত— ডান ও বাম । প্রতিটি অংশে রয়েছে— মেঝে, ছাদ, অভ্যন্তরীন গহ্বর ।

(গ) পার্শ্ব দেয়াল (ল্যাটারাল ওয়াল)-এ তিনটি বিভেদন রয়েছে, যাদের কনকা বা টারবিনেট নামে অভিহিত করা হয়:

১. সুপিরিয়র টারবিনেট (Superior Turbinate)

২. মিডল টারবিনেট (Middle Turbinate)

৩. ইনফেরিওর টারবিনেট (Inferior Turbinate)

(ঘ) অলফ্যাক্টরি মিউকাস (Olfactory Mucous) বা ঘ্রাণ ঝিল্লি। 


অলফ্যাকশন বা ঘ্রাণানুভূতি

অলফ্যাকশন (Olfaction) অর্থ গন্ধ বা ঘ্রাণের অনুভূতি । নাসারন্ধ্র-এ অবস্থিত বিশেষ ধরনের রেশমের দ্বারা এই অনুভূতি সৃষ্টি হয় ।


ঘ্রাণানুভূতির চলনপথ

ঘ্রাণ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাকের বিদ্যমান অলফ্যাক্টরি মিউকোসা ঘ্রাণের উদ্দীপনা গ্রহণ করে । এরপর এটি অলফ্যাক্টরি নার্ভ-এর মাধ্যমে ব্রেইন-এ পৌঁছায় । সেখান থেকে এটি টেম্পোরাল কর্টেক্স-এ অবস্থিত অলফ্যাক্টরি অঞ্চল-এ প্রবেশ করে এবং ঘ্রাণের অনুভূতি সৃষ্টি করে ।


ক্লিনিক্যাল

অ্যানোস্মিয়া (Anosmia): অ্যানোস্মিয়া (Anosmia) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে রোগীর ঘ্রাণানুভূতি সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে। এটি সাধারণত অলফ্যাক্টরি নার্ভ (Olfactory Nerve, Cranial Nerve I)-এর ক্ষতি, আপার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (Upper Respiratory Tract Infection), সাইনোনেজাল ডিজিজ (Sinonasal Disease) অথবা মাথায় আঘাত -এর কারণে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজঅর্ডার (Neurodegenerative Disorder) যেমন পারকিনসন’স ডিজিজ (Parkinson’s Disease) বা আলঝেইমার’স ডিজিজ (Alzheimer’s Disease)-এও অ্যানোস্মিয়া দেখা যায়।


হাইপোস্মিয়া (Hyposmia):  হাইপোস্মিয়া (Hyposmia) হলো ঘ্রাণানুভূতির আংশিক হ্রাস। এটি বয়স বৃদ্ধির সাথে স্বাভাবিকভাবেই ঘটতে পারে, যাকে প্রেসবাইওস্মিয়া (Presbyosmia) বলা হয়। এছাড়া ক্রনিক রাইনোসাইনুসাইটিস (Chronic Rhinosinusitis), নেজাল পলিপ (Nasal Polyp), অ্যালার্জিক রাইনাইটিস (Allergic Rhinitis) অথবা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসার  ফলেও হাইপোস্মিয়া হতে পারে।


ডাইসস্মিয়া (Dysosmia): ডাইসস্মিয়া (Dysosmia) হলো ঘ্রাণানুভূতির বিকৃতি, যেখানে রোগী স্বাভাবিক গন্ধকে বিকৃতভাবে অনুভব করেন। এটি দুইভাবে প্রকাশ পেতে পারে—

=> প্যারোস্মিয়া (Parosmia): স্বাভাবিক গন্ধকে ভিন্ন বা অপ্রীতিকরভাবে অনুভব করা।

=> ফ্যান্টোস্মিয়া (Phantosmia): কোনো বাস্তব গন্ধ না থাকলেও রোগী গন্ধ অনুভব করেন।

ডাইসস্মিয়া সাধারণত পোস্ট-ভাইরাল অলফ্যাক্টরি ডিসফাংশন (Post-viral Olfactory Dysfunction), মাথায় আঘাত অথবা টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি (Temporal Lobe Epilepsy)-এর সাথে সম্পর্কিত।


ন্যাসাল কনজেশন (Nasal Congestion): অ্যালার্জি বা সর্দিজনিত কারণে নাকের অভ্যন্তরীণ রক্ত সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, ফলে এর অভ্যন্তরীণ মিউকাস মেমব্রেন স্ফীত হয় যায়, নাক বন্ধ হয়ে যায়।


ন্যাসাল পলিপাস (Nasal Polyps): নাকের মিউকাস মেমব্রেন স্ফীত হয়ে বহুরূপী স্ফীতি হলে তাকে ন্যাসাল পলিপাস বলা হয় । ন্যাসাল পলিপাস ও ন্যাসাল কনজেশন উভয়ই ন্যাসাল মিউকোসা-র স্ফীতি দেখা যায় । তবে, দুইটি এক বিষয় নয় ।


হাইপারট্রোফাইড টারবিনেটস (Hypertrophied Turbinates): অ্যালার্জি জনিত কারণে নাকের অভ্যন্তরীণ মিউকাস মেমব্রেন স্ফীত হয়ে যায় । এই ঘটনা বার বার ঘটতে থাকলে নাকের ভেতরের টারবিনেট-গুলোর আকার বৃদ্ধি পায় । এই ব্যাপারটিকে হাইপারট্রোফাইড টারবিনেট বলা হয় ।


ডেভিয়েশন অফ ন্যাসাল সেপ্টাম (Deviation of Nasal Septum): নাকের দুই ছিদ্রের মাঝখানে একটি সোজা বিভাজক থাকে । একে ন্যাসাল সেপ্টাম বলা হয় । এই বিভাজকের বক্রতা হলে তাকে ডেভিয়েশন অফ ন্যাসাল সেপ্টাম বলা হয় ।


এপিস্ট্যাক্সিস (Epistaxis): এপিস্ট্যাক্সিস হলো নাক দিয়ে রক্তক্ষরণের অবস্থা। এটি  সাধারণত দুই ধরনের (ক) অ্যান্টেরিয়র এপিস্ট্যাক্সিস (Anterior Epistaxis) যেখানে নাকের সামনের অংশের কিসেলবাখ’স প্লেক্সাস (Kiesselbach’s Plexus) থেকে রক্তপাত হয় এবং তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর (খ)  পোস্টেরিয়র এপিস্ট্যাক্সিস (Posterior Epistaxis) যেখানে স্পেনোপ্যালাটাইন আর্টারি (Sphenopalatine Artery) জড়িত থাকে এবং এটি বেশি গুরুতর ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর কারণ হতে পারে স্থানীয় (যেমন আঘাত, নেজাল ইনফেকশন, নেজাল পলিপ, ডেভিয়েটেড সেপটাম) অথবা সিস্টেমিক রোগ (যেমন হাইপারটেনশন, ব্লাড ডিসঅর্ডার, লিভার ডিজিজ, অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট ড্রাগ)। 


সূচিপত্রে ফিরে যান

প্যারান্যাসাল সাইনাস (Para Nasal Sinus)

প্যারান্যাসাল সাইনাস হলো ন্যাসাল ক্যাভিটি-র (নাসিকা গহ্বরের) চারপাশ বিদ্যমান অস্থি/বায়ুপুর্ণ ফাঁকা স্থান ।


শ্রেণীবিন্যাস

প্যারান্যাসাল সাইনাস নিম্নভাবে জোড়ায় জোড়ায় শ্রেণীবিন্যাস করা যায়:

ক. ফ্রন্টাল (Frontal)

খ. এথময়ডাল (Ethmoidal):

১. অ্যান্টেরিয়র (সম্মুখ)

২. মিডল (মধ্য)

৩. পোস্টেরিয়র (পশ্চাৎ)

গ. ম্যাক্সিলারি (Maxillary)

ঘ. স্ফেনয়ডাল (Sphenoidal)


প্যারান্যাসাল সাইনাস-গুলোর অভ্যন্তরে ফাঁকা স্থান রয়েছে, যা প্যারান্যাসাল সাইনাস ক্যাভিটি বলা হয় । ক্যাভিটিগুলো সিলিয়েটেড কলামনার ধরনের এপিথেলিয়াম দিয়ে তৈরি মিউকাল মেমব্রেন দ্বারা আবৃত ।


প্যারান্যাসাল সাইনাস-এর কাজ

ক. গহ্বরের অভ্যন্তরের বায়ু নিঃশ্বাসের বাতাসকে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা প্রদান করা ।

খ. ধ্বনি উৎপাদনে সহায়তা করা ।

গ. ফেসিয়াল বোন (অস্থি)-গুলোকে হালকা করে এবং মুখমণ্ডলের পূর্ণাঙ্গ আকৃতি প্রদান করা ।


ক্লিনিক্যাল

সাইনুসাইটিস (Sinusitis): এটি প্যারান্যাসাল সাইনাস-এর সাধারণ রোগ । সাইনুসাইটিস হলো সাইনাসের মিউকাস মেমব্রেন-এর ইনফ্ল্যামেশন । এটি সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক ইনফেকশনের কারণে হয় । সাইনুসাইটিস-এর কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো মুখে বা কপালে ব্যথা ও চাপ, মাথাব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বা পুঁজ পড়া এবং গন্ধের অনুভূতি কমে যাওয়া ।


সূচিপত্রে ফিরে যান

ল্যারিংক্স (Larynx)

ল্যারিংক্স (Larynx) হলো আপার রেসপিরেটরি ট্র‍্যাক্ট-এর অংশ যা ধ্বনি তৈরি করে । একে ভোকাল বক্স-ও বলা হয় । এটি ফ্যারিনক্স-এর নিম্ন অংশকে ট্রাকিয়া-র সাথে সংযুক্ত করে ।


অবস্থান

এটি নেক-এর সম্মুখ দিকের মধ্যরেখা বরাবর অবস্থান করে । এটি ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ সার্ভাইক্যাল ভার্টিব্রা বরাবর অবস্থান করে । এটি টাঙ বা জিহ্বার রুট হতে ট্রাকিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত । পুরুষদের অ্যাডামস অ্যাপল নামক একটি উন্নত অংশ দ্বারা এটিকে শনাক্ত করা যায় ।


গঠন

বয়স ভেদে পুরুষদের এর দৈর্ঘ্য ৪৪ মিমি এবং মহিলাদের ৩৬ মিমি । ল্যারিংক্স কার্টিলেজ-এর কাঠামো দ্বারা গঠিত । কার্টিলেজ-গুলো জয়েন্ট, লিগামেন্ট ও মেমব্রেন (ঝিল্লি) দ্বারা আবৃত । কিছু পেশীর প্রভাবে জয়েন্টগুলো কিছু নড়াচড়া সংঘটিত হয় । ল্যারিংক্স গহ্বর (ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যাভিটি) মিউকাস মেমব্রেন দ্বারা আবৃত । উপর দিকের অর্ধাংশের লাইনিং এপিথেলিয়াম স্ট্র্যাটিফাইড স্কোয়ামাস এবং অবশিষ্ট অংশ কলামনার এপিথেলিয়াম ।


ক্লিনিক্যাল

ল্যারিংজাইটিস (Laryngitis): ল্যারিংক্স-এর ইনফ্ল্যামেশন-কে ল্যারিংজাইটিস বলা হয় । এর প্রধান লক্ষণ গলাব্যথা, শুষ্ক কাশি, স্বর পরিবর্তন ইত্যাদি ।

ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার (Laryngeal Cancer): ল্যারিংক্স ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় । এর প্রধান লক্ষণ দীর্ঘ দিন যাবৎ কাশি ও কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন ।


সূচিপত্রে ফিরে যান

ট্রাকিয়া (Trachea)

ট্রাকিয়া (Trachea) বা শ্বাসনালী হলো কার্টিলেজ ও মেমব্রেন দ্বারা তৈরি নলাকার অঙ্গ যা ল্যারিংক্স-এর নিম্ন ধারাবাহিকতা গঠন করে এবং শ্বাসনালী হিসেবে কাজ করে । ট্রাকিয়া আংশিকভাবে নেক ও আংশিক থোরাক্স-এ অবস্থান করে । ট্রাকিয়া-র বেশিরভাগ অংশ মধ্যরেখা বরাবর অবস্থান করে, তবে এর শেষ অংশ সামান্য ডান দিকে অবস্থান করে ।



অবস্থান

ট্রাকিয়া আংশিকভাবে নেক বা গলায় অবস্থান করে ও আংশিক থোরাক্স বা বুকে অবস্থান করে । ক্রিকয়েড কার্টিলেজ-এর নিচের সীমা থেকে এটি আরম্ভ হয়, ঠিক স্টার্নাল অ্যাঙ্গেল-এর পাতে ডান ও বাম প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এ বিভক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত । ট্রাকিয়া-র বেশিরভাগ অংশ মধ্যরেখা বরাবর অবস্থান করে, তবে এর শেষ অংশ সামান্য ডান দিকে অবস্থান করে ।


বৈশিষ্ট্য

ক. দৈর্ঘ্য: পূর্ণ বয়স্কদের ১০-১১ সেমি । সার্ভাইক্যাল অংশ পূর্ণ বয়স্কদের প্রায় ৭ সেমি দীর্ঘ ।

খ. অভ্যন্তরীণ প্রস্থতা: পূর্ণ বয়স্কদের ১২ মিমি ।

গ. গঠন: ট্রাকিয়া ১৬-২০ টি ইংরেজি 'C' আকৃতির হায়ালিন কার্টিলেজ-এর আঙুরি দ্বারা গঠিত । পিছন দিকে আঙুরিগুলো মজবুত ফাইব্রো-ইলাস্টিক মেমব্রেন এবং অনৈচ্ছিক ট্রাকিয়ালিস মাসল (পেশী) দ্বারা সংযুক্ত ।

ঘ. লাইনিং: ট্রাকিয়া-র লুমেন সিলিয়েটেড সিউডো-স্ট্র্যাটিফাইড কলামনার এপিথেলিয়াম দ্বারা গঠিত এবং এতে প্রচুর পরিমাণে ক্ষরণকারী গবলেট সেল (কোষ) বিদ্যমান ।


ক্লিনিক্যাল

ট্রাকিয়াল স্টেনোসিস (Tracheal Stenosis): এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি ইনটিউবেশন । রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক না থাকায় যদি দীর্ঘ দিন ধরে তার শ্বাসনালী-তে টিউব (এন্ডোট্রাকিয়াল টিউব) লাগানো থাকে, তবে শ্বাসনালী-র ভেতরের অংশে ক্ষত তৈরি হয় । এই ক্ষত সেরে ওঠার সময় শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে যায়, যা শ্বাসের পথে বাধা সৃষ্টি করে । এর ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট হয় এবং শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক ঘড়ঘড় শব্দ (স্ট্রিডর) শোনা যায় ।

ট্রাকিআইটিস (Tracheitis): এটি হলো ট্রাকিয়া-র একটি সাধারণ ইনফেকশন, যা সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ঘটে । এটি প্রায়ই সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লু-এর পরে দেখা দেয় । এর প্রধান লক্ষণ হলো খুব শুষ্ক ও তীব্র কাশি, যা বুকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে । এটি বাচ্চাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং সময় মতো চিকিৎসা না হলে এটি নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে ।


ট্রাকিওব্রঙ্কিয়াল কার্সিনোমা (Tracheobronchial Carcinoma): এটি ট্রাকিয়া এবং শ্বাসনালী-র শাখাগুলোতে এক ধরনের ক্যান্সার । এর ফলে ধীরে ধীরে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায় । এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রায়ই অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো মনে হতে পারে, যেমন দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং কাশির সাথে রক্ত পড়া (হিমোপটাইসিস) । এই লক্ষণগুলো প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, যার ফলে রোগটি দেরিতে ধরা পড়ে ।


সূচিপত্রে ফিরে যান

ব্রংকাস (Bronchus)

ট্রাকিয়া-র বিভাজন স্থানে দুইটি প্রিন্সিপাল ব্রংকাস (ডান ও বাম) উৎপন্ন হয় এবং নিজ পার্শ্বীয় লাঙ (ফুসফুস)-এ প্রবেশ করে ।


লাঙ-এ প্রবেশ করার পর বিভাজন

লাঙ-এ প্রবেশের পর এগুলি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়:

ক. লোবার বা সেকেন্ডারি ব্রংকাই: লাঙ-এর প্রতিটি লোবের জন্য ।

খ. এর পর এটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— সেগমেন্টাল বা টারশিয়ারি ব্রংকাই: প্রতিটি ব্রঙ্কোপালমোনারি সেগমেন্ট-এর জন্য একটি করে ।

গ. এর পর এটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— টার্মিনাল ব্রংকাস: সংখ্যায় ৬-১৮ টি ।

ঘ. প্রতিটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— লোবিউলার ব্রংকিওল ।

ঙ. প্রতিটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— টার্মিনাল ব্রংকিওল ।

চ. প্রতিটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— রেসপিরেটরি ব্রংকিওল: সংখ্যায় ৫০-৭০ টি । প্রতিটি অ্যালভিওলার স্যাক-এর সাথে সংযুক্ত হয় এবং অ্যালভিওলাই-এ শেষ হয় ।


ব্রঙ্কিয়াল ট্রি (Bronchial Tree)

লাঙ-এর অভ্যন্তরে বিদ্যমান ব্রংকাই, ব্রংকিয়াল টিউব ও অন্যান্য পার্শ্বীয় অংশের বিশেষ কাঠামোকে ব্রঙ্কিয়াল ট্রি (Bronchial Tree) নামে অভিহিত করা হয় । লাঙ এই ব্রঙ্কিয়াল ট্রি দ্বারা গঠিত ।


ক্লিনিক্যাল

ব্রঙ্কোস্কোপি (Bronchoscopy): ক্লিনিক্যাল অনুশীলনে ব্রঙ্কোস্কোপি হলো একটি সাধারণ পদ্ধতি, যা ব্রংকাস-এর রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয় । এই পদ্ধতিতে একটি পাতলা নল (ব্রঙ্কোস্কোপ) মুখের মধ্য দিয়ে ট্রাকিয়া এবং প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এ প্রবেশ করানো হয় । এর মাধ্যমে ভেতরের অবস্থা সরাসরি দেখা যায়, বায়োপসি নেওয়া যায়, বা আটকে থাকা কোনো ফরেন বডি বের করে আনা যায় ।


ফরেন বডি অ্যাসপিরেশন (Foreign Body Aspiration) : প্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুদের ক্ষেত্রে ছোট বস্তু, যেমন বাদাম, বীজ, ছোট খেলনা বা খাদ্যকণা ভুলবশত শ্বাসনালী-তে প্রবেশ করলে তা প্রায়শই ডান প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এ আটকে যায় । এর কারণ হলো ডান ব্রংকাসটি বাম ব্রংকাসের চেয়ে তুলনামূলকভাবে প্রশস্ত এবং খাড়া (Less Angled) থাকে । এর ফলে, যে কোনো বস্তু ট্রাকিয়া থেকে সরাসরি ডান ব্রংকাস-এ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি । এই অবস্থায় তীব্র কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং শিসের মতো শব্দ (হুইজিং) হতে পারে, যা একটি জরুরি অবস্থা ।
সূচিপত্রে ফিরে যান

দি ডায়াফ্রাম (The Diaphragm)

দি ডায়াফ্রাম (The Diaphragm) বা মধ্যচ্ছদা হলো গম্বুজ আকৃতির মাসকুলোটেন্ডিনাস (টেন্ডন ও পেশী দ্বারা তৈরি) বিভাজক যা থোরাসিক ক্যাভিটি ও অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটি-কে পৃথক করে । একে থোরাকো-অ্যাবডোমিনাল ডায়াফ্রাম নামেও অভিহিত করা হয় । এটি শ্বাস গ্রহণ-এর প্রধান পেশী ।


গঠন

সামনে থেকে দেখলে ডায়াফ্রাম-এর রয়েছে:

১. দুইটি ডোম (গম্বুজ)

(ক) রাইট ডোম (ডান গম্বুজ): এটি ৫ম রিব-এর ঊর্ধ্ব সীমা পর্যন্ত পৌঁছায় । এটি রাইট লাঙ (ডান ফুসফুস)-এর ভার বহন করে । নিচের দিকে এটি লিভার-এর (যকৃতের) সাথে সংশ্লিষ্ট। লিভার-এর কারণে এটি বাম দিকের চেয়ে উঁচু ।

(ক) লেফট ডোম (বাম গম্বুজ): এটি ৫ম রিব-এর নিম্ন সীমা পর্যন্ত পৌঁছায় । এটি লেফট লাঙ (বাম ফুসফুস)-এর ভার বহন করে । নিচের দিকে এটি স্টোমাক (পাকস্থলী), প্লীহা, সুপ্রারেনাল ও কিডনি-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ।

২. সেন্ট্রাল পার্ট (কেন্দ্রীয় অংশ): এটি টেন্ডিনাস অংশ (টেন্ডন দ্বারা তৈরি) । তাই একে সেন্ট্রাল টেন্ডন বলা হয় । এটি জিফিসটার্নাল জয়েন্ট বরাবর অবস্থান করে । এটি হার্ট (হৃৎপিণ্ড)-এর ভার বহন করে ।

৩. রন্ধ্রপথ: দি ডায়াফ্রাম-এ কিছু রন্ধ্র রয়েছে (তিনটি প্রধান ও কয়েকটি অপ্রধান), যেখান দিয়ে কিছু নালীকা থোরাক্স থেকে অ্যাবডোমেন এবং অ্যাবডোমেন থেকে থোরাক্স গমন করে। বৃহৎ রন্ধ্রগুলো হলো:

(ক) ভেনাক্যাভাল: এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে— ইনফেরিওর ভেনাক্যাভা, রাইট ফ্রেনিক নার্ভ-এর শাখা, লিম্ফ ভেসেল (লসিকা নালী) ।

(খ) ইসোফেজিয়াল: এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে— ইসোফেগাস, ভেগাস ট্রাঙ্ক, লেফট গ্যাস্ট্রিক আর্টারি-র ইসোফেজিয়াল শাখা ।

(গ) অ্যাওরটিক: এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে— ডিসেন্ডিং থোরাসিক অ্যাওর্টা, থোরাসিক ডাক্ট, অ্যাজাইগাস ভেইন।



ক্লিনিক্যাল

হায়াটার্ন হার্নিয়া (Hiatal Hernia): হায়াটাস হার্নিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে স্টোমাক (পাকস্থলী)-এর কিছু অংশ ডায়াফ্রাম-এর রন্ধ্রপথের মধ্য দিয়ে বুকের দিকে উঠে আসে । স্বাভাবিকভাবে, খাদ্যনালী বা ইসোফেগাস (Esophagus) দি ডায়াফ্রাম-এর এই রন্ধ্র দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে । বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে পেশী দুর্বল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, বা পেটে অতিরিক্ত চাপ (যেমন দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা অতিরিক্ত ভার উত্তোলন) এর প্রধান কারণ হতে পারে । এর ফলে বুকে জ্বালাপোড়া (হার্টবার্ন), বিশেষ করে খাবার পর ব্যথা, ঢেকুর, এবং কিছু ক্ষেত্রে খাবার গলায় আটকে থাকার অনুভূতি ।


হেঁচকি (Hiccups): হেঁচকি বা হিক্কা হলো ডায়াফ্রাম-এর অনৈচ্ছিক ও অস্বাভাবিক সংকোচন । এই সংকোচনের ফলে দ্রুত শ্বাস টানার সময় ভোকাল কর্ড হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, যার কারণে একটি নির্দিষ্ট শব্দ তৈরি হয় । সাধারণত অতিরিক্ত খাওয়া বা পান করা, কার্বনেটেড পানীয়, বা হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন হেঁচকির কারণ হতে পারে । তবে, কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্নায়ু-সম্পর্কিত সমস্যা বা গুরুতর রোগের লক্ষণ হিসেবেও হেঁচকি দেখা দিতে পারে ।
সূচিপত্রে ফিরে যান

লাঙ (Lung)

লাঙ (Lung) বা ফুসফুস হলো একজোড়া শ্বসন অঙ্গ যা থোরাসিক ক্যাভিটি-তে অবস্থিত । লাঙ দেখতে শঙ্কু আকৃতির । প্রতিটি লাঙ প্লুরা দ্বারা আবৃত থাকে । দুইটি লাঙ মিডিয়াস্টিনাম দ্বারা পৃথকীকৃত । লাঙ গাঠনিকভাবে স্পঞ্জের মতো । যুবকদের লাঙ ধূসর বা বাদামী বর্ণের । পালমোনারি শব্দটি লাঙ-কে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ।


ফুসফুসের সাধারণ গঠন

তুলনামূলকভাবে ফুসফুসের সাধারণ গঠন:

বৈশিষ্ট্য

ডান

বাম

১. আকার

খাটো ও প্রশস্ত

লম্বা ও চাপা

২. ধারণ ক্ষমতা

তুলনামূলক বেশি

তুলনামূলক কম

৩. ফিসার বা খাঁজ

দুইটি

একটি

৪. লোব বা খণ্ডাংশ

তিনটি: ঊর্ধ্ব, মধ্য, নিম্ন

দুইটি: ঊর্ধ্ব ও নিম্ন

৫. ওজন

প্রায় ৭০০ গ্রাম

প্রায় ৬০০ গ্রাম


ফুসফুসের সাধারণ অভ্যন্তরীণ গঠন

ফুসফুস অভ্যন্তরীণভাবে গাঠনিকভাবে স্পঞ্জের মতো । প্রতিটি ফুসফুস লোব নামক একাধিক বৃহৎ খণ্ডাংশে বিভক্ত । আবার প্রতিটি বৃহৎ খণ্ডাংশ সেগমেন্ট নামক একাধিক ক্ষুদ্র খণ্ডাংশে বিভক্ত । সম্পূর্ণ ফুসফুস জুড়ে জালিকার ন্যায় নালিকা রয়েছে । প্রতিটি নালীকা বৃহৎ হতে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে এবং সবশেষে অ্যালভিওলাস নামক একটি থলি দ্বারা আবৃত হয়ে যায়, যেখানে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর আদান প্রদান ঘটে ।


নালিকাগুলোর বিন্যাস

লোবার ব্রংকাস - সেগমেন্টাল ব্রংকাস - টার্মিনাল ব্রংকাস- লোবিউলার ব্রংকিওল- টার্মিনাল ব্রংকিওল- রেসপিরেটরি ব্রংকিওল- অ্যালভিওলার ডাক্ট- অ্যাট্রিয়া- অ্যালভিওলার স্যাক- অ্যালভিওলাস ।


লাঙ জোন (স্থান)

ফুসফুস দুই ধরনের জোনে রয়েছে:

ক. কন্ডাক্টিং জোন (Conducting Zone): এই অংশে কোনো আদান প্রদান ঘটে না । এ অংশ শুধুমাত্র বাতাস পরিবহনের জন্য ।

খ. রেসপিরেটরি জোন (Respiratory Zone): এখানে গ্যাসের (অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড) আদান প্রদান ঘটে ।


লাঙ বা ফুসফুসের কাজ

ফুসফুসের উল্লেখযোগ্য কাজ:

ক. অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের আদান প্রদান ।

খ. ফুসফুস কিছু উদ্বায়ী পদার্থ/বর্জ্য পদার্থ দেহ থেকে নিষ্কাশন করে ।

গ. কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেহের অ্যাসিড ও ক্ষারের সমতা রক্ষা করে ।

ঘ. দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা— জলীয় বাষ্প নিঃসরনের মাধ্যমে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ।

ঙ. রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ।

চ. ধ্বনি তৈরিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।


রেসপিরেটরি সিস্টেমের কাজ (শ্বসন ক্রিয়া)

রেসপিরেটরি সিস্টেমের কাজ (Respiration) বা শ্বসন ক্রিয়া একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অক্সিডেশন-এর (জারণ) জন্য বায়ু মণ্ডল থেকে অক্সিজেন দেহের কোষে পৌঁছায় ।

শ্বসন ক্রিয়ার দুইটি পর্যায় রয়েছে:

ক. শ্বাস গ্রহণ (Inspiration): এর অর্থ ফুসফুসে বাতাস গ্রহণ করা । ডায়াফ্রাম নিচের দিকে নেমে যায় এবং পাঁজর বাইরের দিকে প্রসারিত হয়, যার ফলে বক্ষ গহ্বরের ভেতরের আয়তন বৃদ্ধি পায় । ফলে ফুসফুসের ভেতর বায়ু প্রবেশ করে । এই ক্রিয়া দুই সেকেন্ড স্থায়ী।

খ. শ্বাস ত্যাগ (Expiration): এর অর্থ ফুসফুস থেকে বাতাস বের করে দেওয়া । ডায়াফ্রাম উপরের দিকে উঠে যায় এবং পাঁজর ভেতরের দিকে সংকুচিত হয়, যার ফলে বক্ষ গহ্বরের ভেতরের আয়তন হ্রাস বৃদ্ধি পায় । ফলে ফুসফুসের ভেতর থেকে বায়ু বের হয়ে যায় । এই ক্রিয়া তিন সেকেন্ড স্থায়ী ।


শ্বাস-প্রশ্বাসের হার

ক. স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের হার পূর্ণ বয়স্কদের গড় প্রতি মিনিটে ১০-১৮ ।

খ. বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় অবস্থায় এবং রোগাক্রান্ত অবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাসের হার পরিবর্তিত হতে পারে ।

গ. বয়সের সাথে সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের হার:

১. জন্মর সময়: ১৪-৬০/মিনিট

২. প্রথম বছর: ২৫-৩৫/মিনিট

৩. পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ: ১০-১৮/মিনিট

৪. পূর্ণ বয়স্ক মহিলা: ১০-১৮/মিনিট


শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ

ব্রেইন-এর রেসপিরেটরি সেন্টার দ্বারা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রিত হয় । হাঁচি, কাশি, ঘুমের সময় রেসপিরেটরি সেন্টার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রিয়া করে । এছাড়াও রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশি হলে দেহে একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয় যা ব্রেইন-এর রেসপিরেটরি সেন্টার-কে উত্তেজিত করে এবং শ্বসন ক্রিয়া দ্রুত করে । গর্ভাবস্থাকালীন সময় হরমোনের প্রভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস হার বেড়ে যায় ।

লাঙ-এর আয়তন ও ধারণক্ষমতা (পালমোনারি ভলিউম ও ক্যাপাসিটি)

ক. টাইডাল ভলিউম (Tidal Volume): প্রতিটি স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে প্রায় ৫০০ মিলি বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করে ও বের হয়ে যায় । একে টাইডাল ভলিউম বলা হয় ।


খ. ইনস্পিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম (Inspiratory Reserve Volume): একটি স্বাভাবিক শ্বাস গ্রহণের পরও প্রায় ৩০০০ মিলি বাতাস ফুসফুসে গ্রহণ করা সম্ভব । একে ইনস্পিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম বলা হয় ।


গ. এক্সপিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম (Expiratory Reserve Volume): একটি স্বাভাবিক শ্বাস ত্যাগের পরও প্রায় ১১০০ মিলি বাতাস ফুসফুস থেকে বের করে (জোরপূর্বক) দেওয়া সম্ভব। তাকে এক্সপিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম বলা হয় ।


ঘ. রেসিডিউয়াল রিজার্ভ ভলিউম (Residual Reserve Volume): জোরালো শ্বাস ত্যাগের পরও ফুসফুসে প্রায় ১২০০ মিলি বাতাস অবশিষ্ট থাকে । এই পরিমাণকে রেসিডিউয়াল রিজার্ভ ভলিউম বলা হয় ।


ঙ. ইনস্পিরেটরি ক্যাপাসিটি (Inspiratory Capacity): একজন ব্যক্তি জোরপূর্বক প্রায় ৩৫০০ মিলি বাতাস গ্রহণ করতে পারে । একে ইনস্পিরেটরি ক্যাপাসিটি বলা হয় ।


চ. ফাংশনাল রেসিডিউয়াল ক্যাপাসিটি (Functional Residual Capacity): স্বাভাবিক শ্বাস ত্যাগের পর প্রায় ২৩০০ মিলি বাতাস ফুসফুসে রয়ে যায় । একে ফাংশনাল রেসিডিউয়াল ক্যাপাসিটি বলা হয় ।


ছ. ভাইটাল ক্যাপাসিটি (Vital Capacity): একজন ব্যক্তি ফুসফুস থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৬০০ মিলি বা ৪.৬ লিটার বের করে দিতে পারেন । একে ভাইটাল ক্যাপাসিটি বলা হয় । ভাইটাল ক্যাপাসিটি শ্বাস ক্রিয়ার দক্ষতাকে নির্দেশ করে । ভাইটাল ক্যাপাসিটি পরিমাপের মাধ্যমে ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে এটি হ্রাস পায় ।


জ. টোটাল লাঙ ক্যাপাসিটি (Total Lung Capacity): ফুসফুস প্রায় ৫৮০০ মিলি বাতাস ধারণ করা সম্ভব । একে টোটাল লাঙ ক্যাপাসিটি বলা হয় ।


ঝ. এক্সপিরেটরি ক্যাপাসিটি (Expiratory Capacity): সর্বোচ্চ যে পরিমাণ বাতাস একজন ব্যক্তি ফুসফুস থেকে বের করে দিতে পারে তাকে এক্সপিরেটরি ক্যাপাসিটি বলা হয়।


সকল পালমোনারি ভলিউম ও ক্যাপাসিটি নারীদের ২০-২৫% কম ।


লাঙ ও টিস্যুর মাঝে গ্যাসের বিনিময়

লাঙ ও টিস্যু-এর মাঝে গ্যাসের বিনিময় বলতে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর বিনিময় বোঝায় । এই প্রক্রিয়াটি মূলত রেসপিরেটরি মেমব্রেন দ্বারা ঘটে থাকে । রেসপিরেটরি মেমব্রেন বা শ্বসন পর্দা ফুসফুসে একটি মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ফুসফুসীয় রক্ত ও অ্যালভিওলাই-এর বাতাসের মধ্যে গ্যাসের আদান প্রদান ঘটায় । একে রেসপিরেটরি মেমব্রেন বলে । সাধারণ ভাষায় এটি একটি ছাঁকনি-র মতো ক্রিয়া করে । এই মেমব্রেন-এর এক পাশে লাঙ টিস্যু ও অন্য পাশে রক্ত থাকে । লাঙ টিস্যু-এর অভ্যন্তর থেকে অক্সিজেন মেমব্রেন ভেদ করে রক্তে প্রবেশ করে এবং হিমোগ্লোবিন কর্তৃক গৃহীত হয় (হিমোগ্লোবিন কার্বন ডাই-অক্সাইড মুক্ত করে) এবং সারা দেহে ছড়িয়ে যায় । রক্ত থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড মেমব্রেন ভেদ করে লাঙ টিস্যু-তে প্রবেশ করে এবং শ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে লাঙ থেকে বের হয়ে যায় ।


ক্লিনিক্যাল

ইউপনিয়া (Eupnea): স্বাভাবিক, আরামদায়ক এবং নিশ্চিন্ত শ্বাস-প্রশ্বাসকে বোঝানো হয় । একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের হার প্রতি মিনিটে প্রায় ১২ থেকে ২০ বার । ইউপনিয়া মূলত রেসপিরেটরি ও নার্ভাস সিস্টেম-এর একটি সুষম ও স্বাভাবিক কার্যকারিতার নির্দেশক ।


ট্যাকিপনিয়া (Tachypnea): এটি এমন একটি ক্লিনিক্যাল অবস্থা যেখানে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, প্রতি মিনিটে ২০টির বেশি শ্বাস নেওয়াকে ট্যাকিপনিয়া হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি সাধারণত হাইপোক্সিমিয়া (Hypoxemia), মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস (Metabolic Acidosis), পালমোনারি এম্বোলিজম (Pulmonary Embolism), বা অ্যাংজাইটি (Anxiety)-এর মতো অবস্থার প্রতি শরীরের একটি প্রতিক্রিয়া।


ব্র্যাডিপনিয়া (Bradypnea): এটি স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর গতির শ্বাস-প্রশ্বাসকে নির্দেশ করে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, শ্বাসের হার প্রতি মিনিটে ১২ বারের কম হলে এটিকে ব্র্যাডিপনিয়া বলা হয়। এই অবস্থা সাধারণত ওপিওয়েড  বা সিডেটিভ  ওষুধের অতিরিক্ত সেবন, সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম (Central Nervous System - CNS) ডিসফাংশন বা গুরুতর হাইপোথাইরয়েডিজম -এর কারণে দেখা যেতে পারে।

ডিসপনিয়া (Dyspnea): এটি হলো শ্বাসকষ্ট বা কষ্টকর শ্বাসগ্রহণের একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি (Subjective Experience)। এটিকে প্রায়শই "শর্টনেস অফ ব্রেথ" (Shortness of Breath) হিসাবে বর্ণনা করা হয় এবং এটি কার্ডিয়াক (Cardiac) বা পালমোনারি (Pulmonary) উভয় ধরনের রোগেরই একটি সাধারণ লক্ষণ। যেমন: কনজেস্টিভ কার্ডিয়াক ফেইলিউর (Congestive Cardiac Failure), অ্যাজমা (Asthma), সিওপিডি (COPD) ইত্যাদি।


হাইপোক্সিয়া (Hypoxia): হাইপোক্সিয়া হলো শরীরের টিস্যুগুলোতে  পর্যাপ্ত অক্সিজেন (O2​) পৌঁছাতে বা তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারার একটি প্যাথোফিজিওলজিক্যাল (Pathophysiological) অবস্থা। এর চারটি প্রধান প্রকার রয়েছে: (ক) হাইপোক্সিক হাইপোক্সিয়া, যা অ্যালভিওলাই (Alveoli)-এর গ্যাস বিনিময়ের ব্যর্থতার কারণে ঘটে (যেমন: নিউমোনিয়া, ARDS); (খ) অ্যানিমিক হাইপোক্সিয়া (Anemic Hypoxia), যা রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফল (যেমন: অ্যানিমিয়া, কার্বন মনোক্সাইড পয়েজনিং); (গ) স্ট্যাগন্যান্ট বা সার্কুলেটরি হাইপোক্সিয়া, যা দুর্বল রক্ত সঞ্চালনের কারণে হয় (যেমন: শক, কার্ডিয়াক ফেইলিউর); এবং (ঘ) হিস্টোটক্সিক হাইপোক্সিয়া (Histotoxic Hypoxia), যেখানে টিস্যু সেলগুলো অক্সিজেন ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয় (যেমন: সাইয়ানাইড বিষক্রিয়া)। সমস্ত প্রকারের ক্লিনিক্যাল উপস্থাপনার মধ্যে সাধারণভাবে ডিসপনিয়া (Dyspnea), ট্যাকিপনিয়া (Tachypnea), ট্যাকিকার্ডিয়া (Tachycardia) এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ও সায়ানোসিস (Cyanosis) দেখা যেতে পারে।


হাইপারক্যাপনিয়া (Hypercapnia): হাইপারক্যাপনিয়া হলো রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2​)-এর অস্বাভাবিক এবং অত্যধিক মাত্রা বেড়ে যাওয়া, যা মূলত ফুসফুস (লাঙ) থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে CO2​ নিষ্কাশিত না হওয়ার ফল। এর প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে গুরুতর COPD (Chronic Obstructive Pulmonary Disease) এবং ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা (Bronchial Asthma)-এর মতো রোগাবস্থা,  নিউরোমাসকুলার ডিসঅর্ডার (Neuromuscular Disorders) যা রেসপিরেটরি মাসলগুলোকে দুর্বল করে দেয়, বা ওপিওয়েড (Opioid)-এর মতো ওষুধের কারণে সেন্ট্রাল রেসপিরেটরি ডিপ্রেশন (Central Respiratory Depression)। ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী-এর মধ্যে রয়েছে রক্তনালী প্রসারিত হওয়ার কারণে তীব্র মাথা ব্যথা (Headache), উষ্ণ ত্বক, হাতের কাঁপুনি (Tremor) এবং গুরুতর পরিস্থিতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নার্কোসিস (Carbon Dioxide Narcosis), যা তন্দ্রা  এবং কোমা  সৃষ্টি করতে পারে।


অ্যাসফিক্সিয়া (Asphyxia): অ্যাসফিক্সিয়া হলো এমন একটি গুরুতর ক্লিনিক্যাল অবস্থা যেখানে শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার কারণে শরীরের টিস্যুগুলোতে অক্সিজেন-এর সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায় বা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়, এবং একই সাথে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2​)-এর মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় (গুরুতর হাইপারক্যাপনিয়া)। এটি সাধারণত যান্ত্রিক বাধার কারণে ঘটে, যেমন: শ্বাসনালীর প্রতিবন্ধকতা (বাহ্যিক বস্তুর প্রবেশ), ডুবে যাওয়া, বা শ্বাসরোধ । ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী অত্যন্ত দ্রুত এবং তীব্র হয়: দ্রুত চেতনা হারানো, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যর্থতা, ব্র্যাডিকার্ডিয়া এবং শেষ পর্যন্ত কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট । 


সায়ানোসিস (Cyanosis): সায়ানোসিস হলো ত্বক ও মিউকাস মেমব্রেন -এর নীলচে বর্ণ ধারণ, যা রক্তে ডি-অক্সিজেনেটেড হিমোগ্লোবিন (Deoxygenated Haemoglobin)-এর মাত্রা 5g/dL ছাড়িয়ে গেলে দেখা যায় এবং এটি হাইপোক্সিয়া-এর প্রধান লক্ষণ। এর কারণগুলির মধ্যে রয়েছে সেন্ট্রাল কারণ, যেমন: গুরুতর লাঙ ডিজিজ (নিউমোনিয়া বা পালমোনারি ইডিমা) বা জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease), এবং পেরিফেরাল (Peripheral) কারণ, যেমন: শীতল আবহাওয়া বা দুর্বল স্থানীয় রক্ত সঞ্চালন (শক)। ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী সেন্ট্রাল ক্ষেত্রে জিভ ও ঠোঁটের মিউকাস মেমব্রেন-এ নীল রঙ এবং পেরিফেরাল ক্ষেত্রে হাত-পায়ে নীলচে রঙ দেখায়, যা উষ্ণতায় দূর হতে পারে।


কাশি (Cough): কাশি হলো শ্বাসনালী (Respiratory Tract)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক রিফ্লেক্স (Protective Reflex)। এর প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অ্যাকিউট ভাইরাল ইনফেকশন, ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, নিউমোনিয়া, গ্যাস্ট্রো-ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD), এবং তামাক সেবনজনিত ব্রঙ্কাইটিস বা লাঙ ক্যান্সার  ইত্যাদি। কাশির ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী তার প্রকারভেদে ভিন্ন হয়: এটি গয়ের (Sputum) সহ উত্‍পাদনশীল (Productive) হতে পারে (ইনফেকশনে), অথবা গয়ের ছাড়া শুষ্ক (Dry) হতে পারে, এবং কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর রোগ (যেমন: যক্ষ্মা) নির্দেশ করে হেমপটাইসিস  দেখা দিতে পারে।


স্পুটাম (Sputum):  স্পুটাম বা গয়ার হলো শ্বাসনালী  এবং ফুসফুস থেকে কাশির মাধ্যমে বেরিয়ে আসা শ্লেষ্মা বা তরল (Mucus and Exudate), যা ইনফ্লামেশেন, ইনফেকশন, বা অন্যান্য রোগাবস্থার ফল। এর উৎপত্তি হয় গবলেট সেল (Goblet Cells) এবং সাবমিউকোসাল গ্ল্যান্ড (Submucosal Glands) থেকে। ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিসের জন্য স্পুটামের প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ: পরিষ্কার মিউকয়েড স্পুটাম (Mucoid Sputum) সাধারণত ভাইরাল ইনফেকশন বা অ্যাজমা নির্দেশ করে; হলুদ বা সবুজ, ঘন পিউরুলেন্ট স্পুটাম (Purulent Sputum) ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন (Bacterial Infection) (যেমন: নিউমোনিয়া) নির্দেশ করে; এবং রক্ত মিশ্রিত স্পুটাম (Blood-tinged Sputum) টিবি (Tuberculosis) বা লাঙ ক্যান্সার (Lung Cancer)-এর মতো গুরুতর অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।


হেমপটাইসিস (Haemoptysis) : এটি হলো কাশি আকারে ফুসফুস (Lung) থেকে রক্ত বেরিয়ে আসা। হেমিপ্টিসিসের প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে সংক্রামক রোগ, যেমন: যক্ষ্মা (Tuberculosis - TB) এবং ব্রঙ্কাইকটেসিস (Bronchiectasis); নিওপ্লাস্টিক কারণ, যেমন: লাঙ ক্যান্সার (Lung Cancer); এবং কার্ডিওভাসকুলার কারণ, যেমন: মাইট্রাল স্টেনোসিস (Mitral Stenosis)। ক্লিনিক্যাল লক্ষণ হিসেবে রক্ত সাধারণত ফেনাযুক্ত (Frothy) এবং উজ্জ্বল লাল হয় । 


রেসপিরেটরি ইনসাফিসিয়েন্সি (Respiratory Insufficiency): রেসপিরেটরি ইনসাফিসিয়েন্সি হলো এমন এক মারাত্মক ক্লিনিক্যাল অবস্থা (রোগাবস্থা) যেখানে ফুসফুস (লাঙ) গ্যাস এক্সচেঞ্জ (Gas Exchange) করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে রক্তে হাইপোক্সিমিয়া (Hypoxemia) (O2​ কমে যাওয়া) অথবা হাইপারক্যাপনিয়া (Hypercapnia) (CO2​ বেড়ে যাওয়া), অথবা উভয়ই ঘটে। এর কারণগুলি দু'ধরনের: টাইপ ১ (হাইপোক্সেমিক), যা লাঙের ক্ষতি (যেমন: ARDS, নিউমোনিয়া) থেকে হয়, এবং টাইপ ২ (হাইপারক্যাপনিক), যা ভেন্টিলেশন ফেইলিউর (যেমন: COPD, নিউরোমাসকুলার ডিজিজ) থেকে হয়। ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী-এর মধ্যে রয়েছে তীব্র শ্বাসকষ্ট, ট্যাকিপনিয়া, সায়ানোসিস, এবং হাইপারক্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে কার্বন ডাই-অক্সাইড নার্কোসিস, যার ফলে কনফিউশন/অর্ধ-অচেতনতা ও তন্দ্রা  দেখা দিতে পারে।


ব্রঙ্কাইটিস (Bronchitis): ব্রঙ্কাইটিস হলো শ্বাসনালীর শাখা বা ব্রংকাস (Bronchus)-এর ইনফ্লামেশন (Inflammation), যা অ্যাকিউট (Acute) বা ক্রনিক (Chronic) উভয়ই হতে পারে। অ্যাকিউট ব্রঙ্কাইটিস-এর প্রধান কারণ সাধারণত ভাইরাল ইনফেকশন (যেমন: ইনফ্লুয়েঞ্জা), যেখানে ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস-এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী ধুমপান এবং পরিবেশগত দূষণ। ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী-এর মধ্যে রয়েছে অ্যাকিউট ক্ষেত্রে জ্বর সহ অ্যাকিউট কাশি, এবং ক্রনিক ক্ষেত্রে কমপক্ষে পরপর দুই বছর, প্রতি বছর কমপক্ষে তিন মাস ধরে চলতে থাকা কাশি এবং গয়ের  উত্পাদন, যা সাধারণত ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD)-এর অংশ হিসেবে দেখা যায়।


ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা (Bronchial Asthma): ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা একটি ক্রনিক ইনফ্ল্যামেটরি এয়ারওয়ে ডিসঅর্ডার যেখানে শ্বাসনালীগুলো অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ব্রঙ্কোকনস্ট্রিকশন (ব্রংকাস চেপে যায়) হয়। এর কারণ হিসেবে জেনেটিক প্রবণতা এবং অ্যালার্জেন (Allergens - যেমন: পোলেন), ভাইরাল ইনফেকশন, বা ঠান্ডা বাতাসের মতো পরিবেশগত ট্রিগার (Trigger)-এর সংমিশ্রণ কাজ করে। অ্যাজমার ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী হলো শ্বাস ছাড়ার সময় হুইজিং (শাঁ শাঁ শব্দ), বুকে চাপ অনুভব করা, এবং পর্যায়ক্রমিক তীব্র ডিসপনিয়া (শ্বাসকস্ট), যা প্রায়শই রাতে বা খুব ভোরে তীব্র আকার ধারণ করে।


নিউমোনিয়া (Pneumonia): নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের প্যারেনকাইমা (Parenchyma)-এর ইনফেকশাস ইনফ্লামেশন (Infectious Inflammation), যা অ্যালভিওলাই (Alveoli)-কে তরল বা এক্সুডেট (Exudate) দ্বারা পূর্ণ করে। এর প্রধান কারণ হলো ব্যাকটেরিয়াল (যেমন: স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি - Streptococcus Pneumoniae) বা ভাইরাল (যেমন: ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস) সংক্রমণ। ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী-এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত সূত্রপাত হওয়া উচ্চ জ্বর (Fever) ও শীত শীত ভাব (Rigors), শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে ব্যথা, এবং পুঁজযুক্ত (Purulent) গয়ের সহ কাশি। 


যক্ষ্মা বা টিউবারকিউলোসিস বা টিবি (Tuberculosis - TB): যক্ষ্মা বা টিবি একটি সংক্রামক রোগ যা মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium Tuberculosis) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয় এবং সাধারণত বায়ুবাহিত কণা (Airborne Droplets) মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলীর মধ্যে রয়েছে তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী কাশি, রাতের বেলায় অতিরিক্ত ঘাম হওয়া (Night Sweats), ওজন হ্রাস (Weight Loss), এবং মাঝে মাঝে হেমিপ্টিসিস (রক্ত কাশ) ইত্যাদি। 


লাঙ ক্যান্সার (Lung Cancer): লাঙ ক্যান্সার হলো ফুসফুসের টিস্যু থেকে উদ্ভূত একটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার।  ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলীর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী কাশির প্রকৃতির পরিবর্তন, হেমপটাইসিস (Haemoptysis), স্থানীয়ভাবে বুকে ব্যথা (Chest Pain), ডিসপনিয়া (Dyspnea),  দেহের ওজন হ্রাস ও ক্লান্তি ইত্যাদি।
সূচিপত্রে ফিরে যান

প্লুরা (Pleura)

প্লুরা (Pleura) হলো তন্তুময় থলে আকৃতির অঙ্গ যা লাঙ (ফুসফুস)-কে আবৃত করে রাখে । এটি একটি সেরাস মেমব্রেন যা মেজোথেলিয়াম-এর আবরণ দ্বারা আবৃত । এর প্রধান কাজ ফুসফুসকে আঘাত থেকে রক্ষা করা । সেরাস মেমব্রেন হলো একটি পাতলা আস্তরণ যা বদ্ধ গহ্বর সমূহকে আবৃত করে রাখে ।


প্লুরা-র অংশসমূহ

সাধারণভাবে প্লুরা-র দুইটি অংশ বা স্তর (লেয়ার) রয়েছে, যথা: 

(ক). পালমোনারি প্লুরা বা ভিসেরাল লেয়ার (স্তর): এটি ফুসফুসের সাথে সংযুক্ত থাকে । 

(খ). প্যারাইটাল প্লুরা বা প্যারাইটাল লেয়ার (স্তর): এটি বিভিন্ন অঙ্গ বা স্থানের সাথে সম্পর্কিত।


পালমোনারি ও প্যারাইটাল প্লুরা-র মাঝে প্লুরাল ক্যাভিটি নামক একটি গহ্বর (ক্যাভিটি) রয়েছে। পালমোনারি ও প্যারাইটাল প্লুরা-র অভ্যন্তরীণভাগ এপিথেলিয়াম দ্বারা আবৃত । প্লুরাল ক্যাভিটি-তে প্লুরাল ফ্লুইড নামক একটি তরল পদার্থ থাকে যা প্লুরাল এপিথেলিয়াম কর্তৃক নিঃসৃত হয় । এই তরল পদার্থের কাজ হলো প্লুরা-র স্তর সমূহকে ঘর্ষণ থেকে রক্ষা করা ।

ক্লিনিক্যাল


প্লুরিসি (Pleurisy) বা প্লুরাইটিস (Pleuritis) : প্লুরিসি হলো প্লুরা (Pleura)-র ইনফ্লামেশন, যা সাধারণত ভাইরাস (যেমন: Coxsackievirus) বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ (Bacterial Infection), নিউমোনিয়া (Pneumonia), বা পালমোনারি এম্বোলিজম (Pulmonary Embolism)-এর মতো অন্তর্নিহিত রোগের কারণে ঘটে। এই প্রদাহের ফলে প্লুরাল মেমব্রেন (Pleural Membrane) ইরিটেটেড হয় এবং নার্ভ এন্ডিং (Nerve Ending)-এর মাধ্যমে ব্যথা সৃষ্টি হয়। এর প্রধান ক্লিনিক্যাল লক্ষণ হলো তীব্র, ছুরিকাঘাতের মতো বুকে ব্যথা (Sharp, Stabbing Chest Pain), যা শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় বেড়ে যায়, এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় প্রায়শই প্লুরাল ফ্রিকশন রাব (Pleural Friction Rub) শোনা যায়।


প্লুরাল ইফিউশন (Pleural Effusion): প্লুরাল ইফিউশন হলো প্লুরা (Pleura)-র দুটি স্তরের মাঝে অতিরিক্ত তরল পদার্থ জমে যাওয়া, যা প্লুরাল ফ্লুইড  উত্পাদন এবং শোষণ -এর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফল। এর প্রধান কারণগুলি দু'ধরনের: ট্রান্সউডেটিভ (Transudative), যা সিস্টেমিক প্রেসার পরিবর্তনের কারণে হয় (যেমন: কনজেস্টিভ কার্ডিয়াক ফেইলিউর - CCF, লিভার সিরোসিস), এবং এক্সউডেটিভ (Exudative), যা প্লুরাল মেমব্রেনের প্রদাহ বা রক্তনালী লিকের কারণে হয় (যেমন: নিউমোনিয়া - Parapneumonic Effusion, লাঙ ক্যান্সার)। তরল জমার কারণে ফুসফুসের আয়তন কমে যায়, যার ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী হলো ডিসপনিয়া, বুকে ভার অনুভব করা (Chest Fullness), এবং পরীক্ষায় শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ কমে যাওয়া (Reduced Breath Sounds) সহ ডালনেস অন পারকাশন (Dullness on Percussion)।


হেমোথোরাক্স (Hemothorax): হেমোথোরাক্স হলো প্লুরা (Pleura)-র দুটি স্তরের মাঝে রক্ত (Blood) জমা হওয়া, যা প্রায় সবসময়ই থোরাসিক ট্রমা (Thoracic Trauma)-এর ফল (যেমন: পাঁজর ভেঙে যাওয়া বা রক্তনালী ছিদ্র হওয়া)। অন্যান্য কারণ হলো রোগাক্রান্ত জনিত কারনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালমোনারি আর্টারি ফেটে যাওয়া। প্লুরাল স্পেসে রক্ত সরাসরি প্রবেশ করার কারণে এর ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী দ্রুত দেখা দেয়; রক্তের পরিমাণ বেশি হলে রোগী দ্রুত হাইপোভোলেমিক শক (Hypovolaemic Shock) (রক্তচাপ কমে যাওয়া, ট্যাকিকার্ডিয়া) এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র কষ্ট (Severe Dyspnea) অনুভব করে।


নিউমোথোরাক্স (Pneumothorax): নিউমোথোরাক্স হলো প্লুরা (Pleura)-র দুটি স্তরের মাঝে বাতাস বা গ্যাস (Air or Gas) জমা হওয়া, যার প্রধান কারণ হলো অঘাত। প্লুরাল স্পেসে বাতাস প্রবেশের কারণে ইন্ট্রাপ্লুরাল প্রেসার (Intrapleural Pressure) বেড়ে যায়, যার ফলে ফুসফুস সংকুচিত  হয়ে যায়। এর ক্লিনিক্যাল লক্ষণাবলী হলো আক্রান্ত পাশে হঠাৎ তীব্র ব্যাথা এবং শ্বাসকষ্ট।
সূচিপত্রে ফিরে যান
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর, ২০২৫
ট্যাগসমূহ: ,

হিউম্যান এনাটমি ও ফিজিওলজি 

HUMAN ANATOMY & PHYSIOLOGY



 রেসপিরেটরি সিস্টেম

RESPIRATORY SYSTEM 

মুল পাতায় ফেরত যান

রেসপিরেটরি সিস্টেম

শ্বসনকার্য সম্পন্নকারী অঙ্গগুলোকে সম্মিলিতভাবে রেসপিরেটরি সিস্টেম (Respiratory System) বা শ্বসনতন্ত্র বলা হয় ।

রেসপিরে শন (Respiration) বা শ্বাস-প্রশ্বাস শব্দটি দ্বারা মূলত কোষের জন্য অক্সিজেন গ্রহণ ও কোষ হতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিষ্কাশনকে বোঝায়।

রেসপিরেটরি সিস্টেম-এর অংশসমূহ

রেসপিরেটরি সিস্টেম-এর প্রধান দুইটি বিভাগ রয়েছে, যথা:

  1. ১. আপার রেসপিরেটরি ট্র‍্যাক্ট (Upper Respiratory Tract) বা ঊর্ধ্ব শ্বসনপথ
    এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—
    • ন্যাসাল ক্যাভিটি (Nasal Cavity) বা নাসারন্ধ্র ,
    • ন্যাসোফ্যারিনক্স (Nasopharynx) ,
    • ওরোফ্যারিনক্স (Oropharynx) , এবং
    • ল্যারিংক্স (Larynx) [ ভোকাল কর্ড (Vocal Cord) পর্যন্ত] ।
  2. ২. লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র‍্যাক্ট (Lower Respiratory Tract) বা নিম্ন শ্বসনপথ
    এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—
    • ল্যারিংক্স (ভোকাল কর্ডের নিচে) ,
    • ট্রাকিয়া (Trachea) ,
    • প্রিন্সিপাল ব্রংকাস (Principal Bronchus) ,
    • লোবার ব্রংকাস (Lobar Bronchus) ,
    • সেগমেন্টাল ব্রংকাস (Segmental Bronchus) ,
    • টার্মিনাল ব্রংকিওল (Terminal Bronchiole) ,
    • লোবিউলার ব্রংকিওল (Lobular Bronchiole) ,
    • রেসপিরেটরি ব্রংকিওল (Respiratory Bronchiole) ,
    • অ্যালভিওলার ডাক্ট (Alveolar Duct) ,
    • অ্যাট্রিয়া (Atria) ,
    • এয়ার স্যাক (Air Sac) ,
    • অ্যালভিওলাই (Alveoli)

প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এর শেষ ভাগ থেকে অ্যালভিওলাস পর্যন্ত অংশ লাঙ (Lung) বা ফুসফুস-এর অভ্যন্তরে অবস্থান করে ।

রেসপিরেটরি সিস্টেম-এর প্রধান অঙ্গসমূহ এবং তাদের ক্রিয়া ও অবস্থান/উল্লেখযোগ্য অংশ

অংশ অবস্থান ক্রিয়া/উল্লেখযোগ্য অংশ
নোস (Nose) বা নাসিকা বাহ্যিক বায়ু প্রবেশ ও বাহির হওয়ার স্থান
প্যারান্যাসাল সাইনাস নোস-এর আশপাশ বায়ুকে উষ্ণ করা
ল্যারিংক্স (Larynx) ওরাল ক্যাভিটি (মুখ গহ্বর) লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ ও বাহিরের পথ
ভোকাল কর্ড (Vocal Cord) গলার সম্মুখে লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ পথ এবং ধ্বনি তৈরি
ট্রাকিয়া (Trachea) গলা থেকে বুকের ভিতর পর্যন্ত লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ ও বাহিরের পথ
ব্রংকাস (Bronchus) বুকের অভ্যন্তরে লাঙ-এর অভ্যন্তরে বায়ুর প্রবেশ ও বাহিরের পথ
লাঙ (Lung) বুকের অভ্যন্তরে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বিনিময়
দি ডায়াফ্রাম (The Diaphragm) থোরাক্স ও অ্যাবডোমেন-এর মাঝখানে শ্বসন কার্য সম্পন্ন করা । থোরাক্স ও অ্যাবডোমেন-এর মধ্যে বিভাজক হিসেবে কাজ করে ।
প্লুরা (Pleura) লাঙ-এর চারপাশ লাঙ-কে আবৃত করে রাখা

নোস (Nose) বা নাসিকা বা নাক

নোস (Nose) বা নাক বা নাসিকা প্রধানত শ্বসন অঙ্গ । এছাড়াও এটি ঘ্রাণেন্দ্রিয় হিসেবে কাজ করে ।

গঠন

বাহ্যিক

নোস-এর দুইটি প্রধান বিভাজন রয়েছে:

১. এক্সটার্নাল ন্যারিস (External Nares) বা বহিঃনাসিকা

এই অংশটির কঙ্কাল তান্ত্রিক গঠন রয়েছে, যা আংশিক ভাবে বোন (অস্থি) দ্বারা এবং আংশিক কার্টিলেজ (তরুণাস্থি) দ্বারা তৈরি । এর নিম্নলিখিত অংশ রয়েছে:

  • ক. র‍্যাডিক্স (Radix) বা মূল: নাকের উপরের দিকের অংশ, যা দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে ।
  • খ. টিপ (Tip) বা পা: নাকের নিচের দিকের উঁচু অংশ ।
  • গ. ডরসাম (Dorsum): একে ব্রিজও বলা হয় । এই অংশটি নাকের র‍্যাডিক্স ও টিপ-এর মাঝখানে অবস্থান করে ।
  • ঘ. ন্যাসাল অরিফিস (Nasal Orifice) বা নাসারন্ধ্র: খোলা পথ, যেখান দিয়ে বাতাস নাকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও বের হয় । দুইটি ন্যাসাল অরিফিস রয়েছে— ডান ও বাম।
  • ঙ. ন্যাসাল সেপ্টাম (Nasal Septum): দুইটি ন্যাসাল অরিফিস-এর মাঝখানে বিদ্যমান বিভাজক । এর বাইরের অংশকে কলামিনা বলা হয় ।
  • চ. অ্যালা (Alae): এগুলি নাসারন্ধ্র-এর পার্শ্ব দেয়াল ।
২. ন্যাসাল ক্যাভিটি বা নাসিকা গহ্বর
বিস্তার:

নাসারন্ধ্র হতে ন্যাসোফ্যারিনক্স পর্যন্ত ।

অংশ:

ন্যাসাল সেপ্টাম দ্বারা নাকের অভ্যন্তরীণ অংশ দুই অংশে বিভক্ত— ডান ও বাম । প্রতিটি অংশে রয়েছে— মেঝে, ছাদ, অভ্যন্তরীন গহ্বর ।

পার্শ্ব দেয়াল (ল্যাটারাল ওয়াল)-এ তিনটি বিভেদন রয়েছে, যাদের কনকা বা টারবিনেট নামে অভিহিত করা হয়:

ক. সুপিরিয়র টারবিনেট (Superior Turbinate)
খ. মিডল টারবিনেট (Middle Turbinate)
গ. ইনফেরিওর টারবিনেট (Inferior Turbinate)
ঘ. অলফ্যাক্টরি মিউকাস (Olfactory Mucous) বা ঘ্রাণ ঝিল্লি

অলফ্যাকশন বা ঘ্রাণানুভূতি

অলফ্যাকশন (Olfation) অর্থ গন্ধ বা ঘ্রাণের অনুভূতিনাসারন্ধ্র-এ অবস্থিত বিশেষ ধরনের রেশমের দ্বারা এই অনুভূতি সৃষ্টি হয় ।

ঘ্রাণানুভূতির চলনপথ

ঘ্রাণ গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাকের বিদ্যমান অলফ্যাক্টরি মিউকোসা ঘ্রাণের উদ্দীপনা গ্রহণ করে । এরপর এটি অলফ্যাক্টরি নার্ভ-এর মাধ্যমে ব্রেইন-এ পৌঁছায় । সেখান থেকে এটি টেম্পোরাল কর্টেক্স-এ অবস্থিত অলফ্যাক্টরি অঞ্চল-এ প্রবেশ করে এবং ঘ্রাণের অনুভূতি সৃষ্টি করে ।

ক্লিনিক্যাল

  • ক. অ্যানোস্মিয়া (Anosmia): ঘ্রাণানুভূতি না থাকাকে অ্যানোস্মিয়া বলা হয় ।
  • খ. হাইপোস্মিয়া (Hyposmia): ঘ্রাণানুভূতি হ্রাস পাওয়াকে হাইপোস্মিয়া বলা হয় ।
  • গ. ডাইসস্মিয়া (Dysosmia): বিকৃত ঘ্রাণানুভূতিকে ডাইসস্মিয়া বলা হয় ।
  • ঘ. বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ঘ্রাণশক্তি বাড়তে থাকে এবং ৭৫% - ৮০ বছরের চেয়ে বেশি বয়সী মানুষের ঘ্রাণ ক্ষমতা কমতে থাকে ।
  • ঙ. ন্যাসাল কনজেশন (Nasal Congestion): অ্যালার্জি বা সর্দিজনিত কারণে নাকের অভ্যন্তরীণ রক্ত সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, ফলে এর অভ্যন্তরীণ মিউকাস মেমব্রেন স্ফীত হয় যায়, নাক বন্ধ হয়ে যায় ।
  • চ. ন্যাসাল পলিপাস (Nasal Polyps): নাকের মিউকাস মেমব্রেন স্ফীত হয়ে বহুরূপী স্ফীতি হলে তাকে ন্যাসাল পলিপাস বলা হয় । ন্যাসাল পলিপাস ও ন্যাসাল কনজেশন উভয়ই ন্যাসাল মিউকোসা-র স্ফীতি দেখা যায় । তবে, দুইটি এক বিষয় নয় ।
  • ছ. হাইপারট্রোফাইড টারবিনেটস (Hypertrophied Turbinates): অ্যালার্জি জনিত কারণে নাকের অভ্যন্তরীণ মিউকাস মেমব্রেন স্ফীত হয়ে যায় । এই ঘটনা বার বার ঘটতে থাকলে নাকের ভেতরের টারবিনেট-গুলোর আকার বৃদ্ধি পায় । এই ব্যাপারটিকে হাইপারট্রোফাইড টারবিনেট বলা হয় ।
  • জ. ডেভিয়েশন অফ ন্যাসাল সেপ্টাম (Deviation of Nasal Septum): নাকের দুই ছিদ্রের মাঝখানে একটি সোজা বিভাজক থাকে । একে ন্যাসাল সেপ্টাম বলা হয় । এই বিভাজকের বক্রতা হলে তাকে ডেভিয়েশন অফ ন্যাসাল সেপ্টাম বলা হয় ।
  • ঝ. এপিস্ট্যাক্সিস (Epistaxis): নাক দিয়ে রক্ত ক্ষরণ হলে তাকে এপিস্ট্যাক্সিস বলা হয় ।

প্যারান্যাসাল সাইনাস (Para Nasal Sinus)

প্যারান্যাসাল সাইনাস হলো ন্যাসাল ক্যাভিটি-র (নাসিকা গহ্বরের) চারপাশ বিদ্যমান অস্থি/বায়ুপুর্ণ ফাঁকা স্থান ।

অবস্থান অনুসারে শ্রেণীবিন্যাস

প্যারান্যাসাল সাইনাস নিম্নভাবে জোড়ায় জোড়ায় শ্রেণীবিন্যাস করা যায়:

  • ক. ফ্রন্টাল (Frontal)
  • খ. এথময়ডাল (Ethmoidal):
    • ১. অ্যান্টেরিয়র (সম্মুখ)
    • ২. মিডল (মধ্য)
    • ৩. পোস্টেরিয়র (পশ্চাৎ)
  • গ. ম্যাক্সিলারি (Maxillary)
  • ঘ. স্ফেনয়ডাল (Sphenoidal)

প্যারান্যাসাল সাইনাস-গুলোর অভ্যন্তরে ফাঁকা স্থান রয়েছে, যা প্যারান্যাসাল সাইনাস ক্যাভিটি বলা হয় । ক্যাভিটিগুলো সিলিয়েটেড কলামনার ধরনের এপিথেলিয়াম দিয়ে তৈরি মিউকাল মেমব্রেন দ্বারা আবৃত ।

প্যারান্যাসাল সাইনাস-এর কাজ

  • ক. গহ্বরের অভ্যন্তরের বায়ু নিঃশ্বাসের বাতাসকে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা প্রদান করা ।
  • খ. ধ্বনি উৎপাদনে সহায়তা করা ।
  • গ. ফেসিয়াল বোন (অস্থি)-গুলোকে হালকা করে এবং মুখমণ্ডলের পূর্ণাঙ্গ আকৃতি প্রদান করা ।

ক্লিনিক্যাল

সাইনুসাইটিস (Sinusitis)

এটি প্যারান্যাসাল সাইনাস-এর সাধারণ রোগ । সাইনুসাইটিস হলো সাইনাসের মিউকাস মেমব্রেন-এর ইনফ্ল্যামেশন । এটি সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক ইনফেকশনের কারণে হয় । সাইনুসাইটিস-এর কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো মুখে বা কপালে ব্যথা ও চাপ, মাথাব্যথা, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বা পুঁজ পড়া এবং গন্ধের অনুভূতি কমে যাওয়া ।

ল্যারিংক্স (Larynx)

ল্যারিংক্স (Larynx) হলো আপার রেসপিরেটরি ট্র‍্যাক্ট-এর অংশ যা ধ্বনি তৈরি করে । একে ভোকাল বক্স-ও বলা হয় । এটি ফ্যারিনক্স-এর নিম্ন অংশকে ট্রাকিয়া-র সাথে সংযুক্ত করে ।

অবস্থান

এটি নেক-এর সম্মুখ দিকের মধ্যরেখা বরাবর অবস্থান করে । এটি ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ সার্ভাইক্যাল ভার্টিব্রা বরাবর অবস্থান করে । এটি টাঙ বা জিহ্বার রুট হতে ট্রাকিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত । পুরুষদের অ্যাডামস অ্যাপল নামক একটি উন্নত অংশ দ্বারা এটিকে শনাক্ত করা যায় ।

গঠন

বয়স ভেদে পুরুষদের এর দৈর্ঘ্য ৪৪ মিমি এবং মহিলাদের ৩৬ মিমিল্যারিংক্স কার্টিলেজ-এর কাঠামো দ্বারা গঠিত । কার্টিলেজ-গুলো জয়েন্ট, লিগামেন্ট ও মেমব্রেন (ঝিল্লি) দ্বারা আবৃত । কিছু পেশীর প্রভাবে জয়েন্টগুলো কিছু নড়াচড়া সংঘটিত হয় । ল্যারিংক্স গহ্বর (ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যাভিটি) মিউকাস মেমব্রেন দ্বারা আবৃত । উপর দিকের অর্ধাংশের লাইনিং এপিথেলিয়াম স্ট্র্যাটিফাইড স্কোয়ামাস এবং অবশিষ্ট অংশ কলামনার এপিথেলিয়াম

ক্লিনিক্যাল

ল্যারিংজাইটিস (Laryngitis)

ল্যারিংক্স-এর ইনফ্ল্যামেশন-কে ল্যারিংজাইটিস বলা হয় । এর প্রধান লক্ষণ গলাব্যথা, শুষ্ক কাশি, স্বর পরিবর্তন ইত্যাদি ।

ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার (Laryngeal Cancer)

ল্যারিংক্স ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় । এর প্রধান লক্ষণ দীর্ঘ দিন যাবৎ কাশি ও কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন ।

ট্রাকিয়া (Trachea)

ট্রাকিয়া (Trachea) বা শ্বাসনালী হলো কার্টিলেজ ও মেমব্রেন দ্বারা তৈরি নলাকার অঙ্গ যা ল্যারিংক্স-এর নিম্ন ধারাবাহিকতা গঠন করে এবং শ্বাসনালী হিসেবে কাজ করে । ট্রাকিয়া আংশিকভাবে নেক ও আংশিক থোরাক্স-এ অবস্থান করে । ট্রাকিয়া-র বেশিরভাগ অংশ মধ্যরেখা বরাবর অবস্থান করে, তবে এর শেষ অংশ সামান্য ডান দিকে অবস্থান করে ।

অবস্থান

ট্রাকিয়া আংশিকভাবে নেক বা গলায় অবস্থান করে ও আংশিক থোরাক্স বা বুকে অবস্থান করে । ক্রিকয়েড কার্টিলেজ-এর নিচের সীমা থেকে এটি আরম্ভ হয়, ঠিক স্টার্নাল অ্যাঙ্গেল-এর পাতে ডান ও বাম প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এ বিভক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত । ট্রাকিয়া-র বেশিরভাগ অংশ মধ্যরেখা বরাবর অবস্থান করে, তবে এর শেষ অংশ সামান্য ডান দিকে অবস্থান করে ।

বৈশিষ্ট্য

  • ক. দৈর্ঘ্য: পূর্ণ বয়স্কদের ১০-১১ সেমি । সার্ভাইক্যাল অংশ পূর্ণ বয়স্কদের প্রায় ৭ সেমি দীর্ঘ ।
  • খ. অভ্যন্তরীণ প্রস্থতা: পূর্ণ বয়স্কদের ১২ মিমি
  • গ. গঠন: ট্রাকিয়া ১৬-২০ টি ইংরেজি 'C' আকৃতির হায়ালিন কার্টিলেজ-এর আঙুরি দ্বারা গঠিত । পিছন দিকে আঙুরিগুলো মজবুত ফাইব্রো-ইলাস্টিক মেমব্রেন এবং অনৈচ্ছিক ট্রাকিয়ালিস মাসল (পেশী) দ্বারা সংযুক্ত ।
  • ঘ. লাইনিং: ট্রাকিয়া-র লুমেন সিলিয়েটেড সিউডো-স্ট্র্যাটিফাইড কলামনার এপিথেলিয়াম দ্বারা গঠিত এবং এতে প্রচুর পরিমাণে ক্ষরণকারী গবলেট সেল (কোষ) বিদ্যমান ।

ক্লিনিক্যাল

ট্রাকিয়াল স্টেনোসিস (Tracheal Stenosis)

এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি ইনটিউবেশন । রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক না থাকায় যদি দীর্ঘ দিন ধরে তার শ্বাসনালী-তে টিউব (এন্ডোট্রাকিয়াল টিউব) লাগানো থাকে, তবে শ্বাসনালী-র ভেতরের অংশে ক্ষত তৈরি হয় । এই ক্ষত সেরে ওঠার সময় শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে যায়, যা শ্বাসের পথে বাধা সৃষ্টি করে । এর ফলে রোগীর শ্বাসকষ্ট হয় এবং শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক ঘড়ঘড় শব্দ (স্ট্রিডর) শোনা যায় ।

ট্রাকিয়াতে সংক্রমণ (Infections of the Trachea)

ট্রাকিআইটিস (Tracheitis) হলো ট্রাকিয়া-র একটি সাধারণ সংক্রমণ, যা সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ঘটে । এটি প্রায়ই সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লু-এর পরে দেখা দেয় । এর প্রধান লক্ষণ হলো খুব শুষ্ক ও তীব্র কাশি, যা বুকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে । এটি বাচ্চাদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং সময় মতো চিকিৎসা না হলে এটি নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে ।

ট্রাকিওব্রঙ্কিয়াল কার্সিনোমা (Tracheobronchial Carcinoma)

এটি ট্রাকিয়া এবং শ্বাসনালী-র শাখাগুলোতে এক ধরনের ক্যান্সার । এর ফলে ধীরে ধীরে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায় । এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রায়ই অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো মনে হতে পারে, যেমন দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং কাশির সাথে রক্ত পড়া (হিমোপটাইসিস) । এই লক্ষণগুলো প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, যার ফলে রোগটি দেরিতে ধরা পড়ে ।

ব্রংকাস (Bronchus)

ট্রাকিয়া-র বিভাজন স্থানে দুইটি প্রিন্সিপাল ব্রংকাস (ডান ও বাম) উৎপন্ন হয় এবং নিজ পার্শ্বীয় লাঙ (ফুসফুস)-এ প্রবেশ করে ।

লাঙ-এ প্রবেশ করার পর বিভাজন

লাঙ-এ প্রবেশের পর এগুলি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়:

  • ক. লোবার বা সেকেন্ডারি ব্রংকাই: লাঙ-এর প্রতিটি লোবের জন্য ।
  • খ. এর পর এটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— সেগমেন্টাল বা টারশিয়ারি ব্রংকাই: প্রতিটি ব্রঙ্কোপালমোনারি সেগমেন্ট-এর জন্য একটি করে ।
  • গ. এর পর এটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— টার্মিনাল ব্রংকাস: সংখ্যায় ৬-১৮ টি
  • ঘ. প্রতিটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— লোবিউলার ব্রংকিওল
  • ঙ. প্রতিটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— টার্মিনাল ব্রংকিওল
  • চ. প্রতিটি নিম্ন উল্লেখিত ভাবে বিভক্ত হয়— রেসপিরেটরি ব্রংকিওল: সংখ্যায় ৫০-৭০ টি । প্রতিটি অ্যালভিওলার স্যাক-এর সাথে সংযুক্ত হয় এবং অ্যালভিওলাই-এ শেষ হয় ।

ব্রঙ্কিয়াল ট্রি (Bronchial Tree)

লাঙ-এর অভ্যন্তরে বিদ্যমান ব্রংকাই, ব্রংকিয়াল টিউব ও অন্যান্য পার্শ্বীয় অংশের বিশেষ কাঠামোকে ব্রঙ্কিয়াল ট্রি (Bronchial Tree) নামে অভিহিত করা হয় । লাঙ এই ব্রঙ্কিয়াল ট্রি দ্বারা গঠিত ।

ক্লিনিক্যাল

ব্রঙ্কোস্কোপি (Bronchoscopy)

ক্লিনিক্যাল অনুশীলনে ব্রঙ্কোস্কোপি হলো একটি সাধারণ পদ্ধতি, যা ব্রংকাস-এর রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয় । এই পদ্ধতিতে একটি পাতলা নল (ব্রঙ্কোস্কোপ) মুখের মধ্য দিয়ে ট্রাকিয়া এবং প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এ প্রবেশ করানো হয় । এর মাধ্যমে ভেতরের অবস্থা সরাসরি দেখা যায়, বায়োপসি নেওয়া যায়, বা আটকে থাকা কোনো ফরেন বডি বের করে আনা যায় ।

ফরেন বডি অ্যাসপিরেশন (Foreign Body Aspiration)

প্রাপ্তবয়স্ক বা শিশুদের ক্ষেত্রে ছোট বস্তু, যেমন বাদাম, বীজ, ছোট খেলনা বা খাদ্যকণা ভুলবশত শ্বাসনালী-তে প্রবেশ করলে তা প্রায়শই ডান প্রিন্সিপাল ব্রংকাস-এ আটকে যায় । এর কারণ হলো ডান ব্রংকাসটি বাম ব্রংকাসের চেয়ে তুলনামূলকভাবে প্রশস্ত এবং খাড়া (Less Angled) থাকে । এর ফলে, যে কোনো বস্তু ট্রাকিয়া থেকে সরাসরি ডান ব্রংকাস-এ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি । এই অবস্থায় তীব্র কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং শিসের মতো শব্দ (হুইজিং) হতে পারে, যা একটি জরুরি অবস্থা ।

দি ডায়াফ্রাম (The Diaphragm)

দি ডায়াফ্রাম (The Diaphragm) বা মধ্যচ্ছদা হলো গম্বুজ আকৃতির মাসকুলোটেন্ডিনাস (টেন্ডন ও পেশী দ্বারা তৈরি) বিভাজক যা থোরাসিক ক্যাভিটি ও অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটি-কে পৃথক করে । একে থোরাকো-অ্যাবডোমিনাল ডায়াফ্রাম নামেও অভিহিত করা হয় । এটি শ্বাস গ্রহণ-এর প্রধান পেশী

গঠন

সামনে থেকে দেখলে ডায়াফ্রাম-এর রয়েছে:

  • ১. দুইটি ডোম (গম্বুজ)
    • রাইট ডোম (ডান গম্বুজ): এটি ৫ম রিব-এর ঊর্ধ্ব সীমা পর্যন্ত পৌঁছায় । এটি রাইট লাঙ (ডান ফুসফুস)-এর ভার বহন করে । নিচের দিকে এটি লিভার-এর (যকৃতের) সাথে সংশ্লিষ্ট । লিভার-এর কারণে এটি বাম দিকের চেয়ে উঁচু ।
    • লেফট ডোম (বাম গম্বুজ): এটি ৫ম রিব-এর নিম্ন সীমা পর্যন্ত পৌঁছায় । এটি লেফট লাঙ (বাম ফুসফুস)-এর ভার বহন করে । নিচের দিকে এটি স্টোমাক (পাকস্থলী), প্লীহা, সুপ্রারেনাল ও কিডনি-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ।
  • ২. সেন্ট্রাল পার্ট (কেন্দ্রীয় অংশ)

    এটি টেন্ডিনাস অংশ (টেন্ডন দ্বারা তৈরি) । তাই একে সেন্ট্রাল টেন্ডন বলা হয় । এটি জিফিসটার্নাল জয়েন্ট বরাবর অবস্থান করে । এটি হার্ট (হৃৎপিণ্ড)-এর ভার বহন করে ।

  • ৩. রন্ধ্রপথ

    দি ডায়াফ্রাম-এ কিছু রন্ধ্র রয়েছে (তিনটি প্রধান ও কয়েকটি অপ্রধান), যেখান দিয়ে কিছু নালীকা থোরাক্স থেকে অ্যাবডোমেন এবং অ্যাবডোমেন থেকে থোরাক্স গমন করে। বৃহৎ রন্ধ্রগুলো হলো:

    • ভেনাক্যাভাল: এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে— ইনফেরিওর ভেনাক্যাভা, রাইট ফ্রেনিক নার্ভ-এর শাখা, লিম্ফ ভেসেল (লসিকা নালী) ।
    • ইসোফেজিয়াল: এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে— ইসোফেগাস, ভেগাস ট্রাঙ্ক, লেফট গ্যাস্ট্রিক আর্টারি-র ইসোফেজিয়াল শাখা
    • অ্যায়োরটিক: ডিসেন্ডিং থোরাসিক অ্যাওর্টা, থোরাসিক ডাক্ট, অ্যাজাইগাস ভেইন

ক্লিনিক্যাল

হায়াটার্ন হার্নিয়া (Hiatal Hernia)

হায়াটাস হার্নিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে স্টোমাক (পাকস্থলী)-এর কিছু অংশ ডায়াফ্রাম-এর রন্ধ্রপথের মধ্য দিয়ে বুকের দিকে উঠে আসে । স্বাভাবিকভাবে, খাদ্যনালী বা ইসোফেগাস (Esophagus) দি ডায়াফ্রাম-এর এই রন্ধ্র দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে । বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে পেশী দুর্বল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন, বা পেটে অতিরিক্ত চাপ (যেমন দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা অতিরিক্ত ভার উত্তোলন) এর প্রধান কারণ হতে পারে । এর ফলে বুকে জ্বালাপোড়া (হার্টবার্ন), বিশেষ করে খাবার পর ব্যথা, ঢেকুর, এবং কিছু ক্ষেত্রে খাবার গলায় আটকে থাকার অনুভূতি ।

হেঁচকি (Hiccups)

হেঁচকি বা হিক্কা হলো ডায়াফ্রাম-এর অনৈচ্ছিক ও অস্বাভাবিক সংকোচন । এই সংকোচনের ফলে দ্রুত শ্বাস টানার সময় ভোকাল কর্ড হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, যার কারণে একটি নির্দিষ্ট শব্দ তৈরি হয় । সাধারণত অতিরিক্ত খাওয়া বা পান করা, কার্বনেটেড পানীয়, বা হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন হেঁচকির কারণ হতে পারে । তবে, কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্নায়ু-সম্পর্কিত সমস্যা বা গুরুতর রোগের লক্ষণ হিসেবেও হেঁচকি দেখা দিতে পারে ।

লাঙ (Lung)

লাঙ (Lung) বা ফুসফুস হলো একজোড়া শ্বসন অঙ্গ যা থোরাসিক ক্যাভিটি-তে অবস্থিত । লাঙ দেখতে শঙ্কু আকৃতির । প্রতিটি লাঙ প্লুরা দ্বারা আবৃত থাকে । দুইটি লাঙ মিডিয়াস্টিনাম দ্বারা পৃথকীকৃত । লাঙ গাঠনিকভাবে স্পঞ্জের মতো । যুবকদের লাঙ ধূসর বা বাদামী বর্ণেরপালমোনারি শব্দটি লাঙ-কে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ।

ফুসফুসের সাধারণ গঠন

তুলনামূলকভাবে ফুসফুসের সাধারণ গঠন:

বৈশিষ্ট্য ডান বাম
১. আকার খাটো ও প্রশস্ত লম্বা ও চাপা
২. ধারণ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি তুলনামূলক কম
৩. ফিসার বা খাঁজ দুইটি একটি
৪. লোব বা খণ্ডাংশ তিনটি: ঊর্ধ্ব, মধ্য, নিম্ন দুইটি: ঊর্ধ্ব ও নিম্ন
৫. ওজন প্রায় ৭০০ গ্রাম প্রায় ৬০০ গ্রাম

ফুসফুসের সাধারণ অভ্যন্তরীণ গঠন

ফুসফুস অভ্যন্তরীণভাবে গাঠনিকভাবে স্পঞ্জের মতো । প্রতিটি ফুসফুস লোব নামক একাধিক বৃহৎ খণ্ডাংশে বিভক্ত । আবার প্রতিটি বৃহৎ খণ্ডাংশ সেগমেন্ট নামক একাধিক ক্ষুদ্র খণ্ডাংশে বিভক্ত । সম্পূর্ণ ফুসফুস জুড়ে জালিকার ন্যায় নালিকা রয়েছে । প্রতিটি নালীকা বৃহৎ হতে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে এবং সবশেষে অ্যালভিওলাস নামক একটি থলি দ্বারা আবৃত হয়ে যায়, যেখানে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর আদান প্রদান ঘটে ।

নালিকাগুলোর বিন্যাস

লোবার ব্রংকাস - সেগমেন্টাল ব্রংকাস - টার্মিনাল ব্রংকাস- লোবিউলার ব্রংকিওল- টার্মিনাল ব্রংকিওল- রেসপিরেটরি ব্রংকিওল- অ্যালভিওলার ডাক্ট- অ্যাট্রিয়া- অ্যালভিওলার স্যাক- অ্যালভিওলাস

লাঙ জোন (স্থান)

ফুসফুস দুই ধরনের জোনে রয়েছে:

  • ক. কন্ডাক্টিং জোন (Conducting Zone): এই অংশে কোনো আদান প্রদান ঘটে না । এ অংশ শুধুমাত্র বাতাস পরিবহনের জন্য ।
  • খ. রেসপিরেটরি জোন (Respiratory Zone): এখানে গ্যাসের (অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড) আদান প্রদান ঘটে ।

লাঙ বা ফুসফুসের কাজ

ফুসফুসের উল্লেখযোগ্য কাজ:

  • ক. অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের আদান প্রদান
  • খ. ফুসফুস কিছু উদ্বায়ী পদার্থ/বর্জ্য পদার্থ দেহ থেকে নিষ্কাশন করে ।
  • গ. কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেহের অ্যাসিড ও ক্ষারের সমতা রক্ষা করে ।
  • ঘ. দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা— জলীয় বাষ্প নিঃসরনের মাধ্যমে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ।
  • ঙ. রক্ত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ।
  • চ. ধ্বনি তৈরিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

রেসপিরেটরি সিস্টেমের কাজ (শ্বসন ক্রিয়া)

রেসপিরেটরি সিস্টেমের কাজ (Respiration) বা শ্বসন ক্রিয়া একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অক্সিডেশন-এর (জারণ) জন্য বায়ু মণ্ডল থেকে অক্সিজেন দেহের কোষে পৌঁছায়

শ্বসন ক্রিয়ার দুইটি পর্যায় রয়েছে:

ক. শ্বাস গ্রহণ (Inspiration): এর অর্থ ফুসফুসে বাতাস গ্রহণ করা । ডায়াফ্রাম নিচের দিকে নেমে যায় এবং পাঁজর বাইরের দিকে প্রসারিত হয়, যার ফলে বক্ষ গহ্বরের ভেতরের আয়তন বৃদ্ধি পায় । ফলে ফুসফুসের ভেতর বায়ু প্রবেশ করে । এই ক্রিয়া দুই সেকেন্ড স্থায়ী
  • খ. শ্বাস ত্যাগ (Expiration): এর অর্থ ফুসফুস থেকে বাতাস বের করে দেওয়া । ডায়াফ্রাম উপরের দিকে উঠে যায় এবং পাঁজর ভেতরের দিকে সংকুচিত হয়, যার ফলে বক্ষ গহ্বরের ভেতরের আয়তন হ্রাস বৃদ্ধি পায় । ফলে ফুসফুসের ভেতর থেকে বায়ু বের হয়ে যায় । এই ক্রিয়া তিন সেকেন্ড স্থায়ী

শ্বাস-প্রশ্বাসের হার

  • ক. স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের হার পূর্ণ বয়স্কদের গড় প্রতি মিনিটে ১০-১৮
  • খ. বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় অবস্থায় এবং রোগাক্রান্ত অবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাসের হার পরিবর্তিত হতে পারে ।
  • গ. বয়সের সাথে সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের হার:
    • ১. জন্মর সময়: ১৪-৬০/মিনিট
    • ২. প্রথম বছর: ২৫-৩৫/মিনিট
    • ৩. পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ: ১০-১৮/মিনিট
    • ৪. পূর্ণ বয়স্ক মহিলা: ১০-১৮/মিনিট

শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ

ব্রেইন-এর রেসপিরেটরি সেন্টার দ্বারা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রিত হয় । হাঁচি, কাশি, ঘুমের সময় রেসপিরেটরি সেন্টার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রিয়া করে । এছাড়াও রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশি হলে দেহে একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয় যা ব্রেইন-এর রেসপিরেটরি সেন্টার-কে উত্তেজিত করে এবং শ্বসন ক্রিয়া দ্রুত করে । গর্ভাবস্থাকালীন সময় হরমোনের প্রভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস হার বেড়ে যায় ।

লাঙ-এর আয়তন ও ধারণক্ষমতা (পালমোনারি ভলিউম ও ক্যাপাসিটি)

  • ক. টাইডাল ভলিউম (Tidal Volume): প্রতিটি স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে প্রায় ৫০০ মিলি বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করে ও বের হয়ে যায় । একে টাইডাল ভলিউম বলা হয় ।
  • খ. ইনস্পিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম (Inspiratory Reserve Volume): একটি স্বাভাবিক শ্বাস গ্রহণের পরও প্রায় ৩০০০ মিলি বাতাস ফুসফুসে গ্রহণ করা সম্ভব । একে ইনস্পিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম বলা হয় ।
  • গ. এক্সপিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম (Expiratory Reserve Volume): একটি স্বাভাবিক শ্বাস ত্যাগের পরও প্রায় ১১০০ মিলি বাতাস ফুসফুস থেকে বের করে (জোরপূর্বক) দেওয়া সম্ভব । তাকে এক্সপিরেটরি রিজার্ভ ভলিউম বলা হয় ।
  • ঘ. রেসিডিউয়াল রিজার্ভ ভলিউম (Residual Reserve Volume): জোরালো শ্বাস ত্যাগের পরও ফুসফুসে প্রায় ১২০০ মিলি বাতাস অবশিষ্ট থাকে । এই পরিমাণকে রেসিডিউয়াল রিজার্ভ ভলিউম বলা হয় ।
  • ঙ. ইনস্পিরেটরি ক্যাপাসিটি (Inspiratory Capacity): একজন ব্যক্তি জোরপূর্বক প্রায় ৩৫০০ মিলি বাতাস গ্রহণ করতে পারে । একে ইনস্পিরেটরি ক্যাপাসিটি বলা হয় ।
  • চ. ফাংশনাল রেসিডিউয়াল ক্যাপাসিটি (Functional Residual Capacity): স্বাভাবিক শ্বাস ত্যাগের পর প্রায় ২৩০০ মিলি বাতাস ফুসফুসে রয়ে যায় । একে ফাংশনাল রেসিডিউয়াল ক্যাপাসিটি বলা হয় ।
  • ছ. ভাইটাল ক্যাপাসিটি (Vital Capacity): একজন ব্যক্তি ফুসফুস থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৬০০ মিলি বা ৪.৬ লিটার বের করে দিতে পারেন । একে ভাইটাল ক্যাপাসিটি বলা হয় । ভাইটাল ক্যাপাসিটি শ্বাস ক্রিয়ার দক্ষতাকে নির্দেশ করে । ভাইটাল ক্যাপাসিটি পরিমাপের মাধ্যমে ফুসফুসের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় । ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে এটি হ্রাস পায় ।
  • জ. টোটাল লাঙ ক্যাপাসিটি (Total Lung Capacity): ফুসফুস প্রায় ৫৮০০ মিলি বাতাস ধারণ করা সম্ভব । একে টোটাল লাঙ ক্যাপাসিটি বলা হয় ।
  • ঝ. এক্সপিরেটরি ক্যাপাসিটি (Expiratory Capacity): সর্বোচ্চ যে পরিমাণ বাতাস একজন ব্যক্তি ফুসফুস থেকে বের করে দিতে পারে তাকে এক্সপিরেটরি ক্যাপাসিটি বলা হয়।
  • ঞ. সকল পালমোনারি ভলিউম ও ক্যাপাসিটি নারীদের ২০-২৫% কম

লাঙ ও টিস্যুর মাঝে গ্যাসের বিনিময়

লাঙ ও টিস্যু-এর মাঝে গ্যাসের বিনিময় বলতে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর বিনিময় বোঝায় । এই প্রক্রিয়াটি মূলত রেসপিরেটরি মেমব্রেন দ্বারা ঘটে থাকে । রেসপিরেটরি মেমব্রেন বা শ্বসন পর্দা ফুসফুসে একটি মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ফুসফুসীয় রক্ত ও অ্যালভিওলাই-এর বাতাসের মধ্যে গ্যাসের আদান প্রদান ঘটায় । একে রেসপিরেটরি মেমব্রেন বলে । সাধারণ ভাষায় এটি একটি ছাঁকনি-র মতো ক্রিয়া করে । এই মেমব্রেন-এর এক পাশে লাঙ টিস্যু ও অন্য পাশে রক্ত থাকে । লাঙ টিস্যু-এর অভ্যন্তর থেকে অক্সিজেন মেমব্রেন ভেদ করে রক্তে প্রবেশ করে এবং হিমোগ্লোবিন কর্তৃক গৃহীত হয় (হিমোগ্লোবিন কার্বন ডাই-অক্সাইড মুক্ত করে) এবং সারা দেহে ছড়িয়ে যায় । রক্ত থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড মেমব্রেন ভেদ করে লাঙ টিস্যু-তে প্রবেশ করে এবং শ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে লাঙ থেকে বের হয়ে যায় ।

ক্লিনিক্যাল

  • ক. ইউপনিয়া (Eupnea): স্বাভাবিক, আরামদায়ক এবং নিশ্চিন্ত শ্বাস-প্রশ্বাসকে বোঝানো হয় । একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের হার প্রতি মিনিটে প্রায় ১২ থেকে ২০ বারইউপনিয়া মূলত রেসপিরেটরি ও নার্ভাস সিস্টেম-এর একটি সুষম ও স্বাভাবিক কার্যকারিতার নির্দেশক ।
  • খ. ট্যাকিপনিয়া (Tachypnea): হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত । একজন প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি মিনিটে ২০টির বেশি শ্বাস নেওয়াকে ট্যাকিপনিয়া হিসেবে ধরা হয় ।
  • গ. ব্র্যাডিপনিয়া (Bradypnea): হলো স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর গতির শ্বাস-প্রশ্বাস, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্কের শ্বাসের হার প্রতি মিনিটে ১২ বারের কম হয় ।
  • ঘ. ডিসপনিয়া (Dyspnea): হলো শ্বাসকষ্ট বা কষ্টকর শ্বাসগ্রহণের একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি।
  • ঙ. অ্যানোক্সিয়া (Anoxia): হলো শরীরের টিস্যু বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন-এর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি, যা হাইপোক্সিয়া-এর চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর ।
  • চ. হাইপারক্যাপনিয়া (Hypercapnia): বলতে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)-এর অস্বাভাবিক এবং অত্যধিক মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে বোঝায় ।
  • ছ. স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea): হলো ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া
    • ১. অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (Obstructive Sleep Apnea): যেখানে গলার মাসল শিথিল হয়ে শ্বাসনালী বন্ধ করে দেয় ।
    • ২. সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া (Central Sleep Apnea): যেখানে মস্তিষ্ক শ্বাস-প্রশ্বাসের সংকেত দিতে ব্যর্থ হয় ।
  • জ. অ্যাসফিক্সিয়া (Asphyxia): একটি জীবন-বিপন্নকর অবস্থা, যেখানে শরীরের টিস্যুগুলোতে অক্সিজেন-এর সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায় অথবা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং একই সাথে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড-এর মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়
  • ঝ. হাইপোক্সিয়া (Hypoxia): হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের টিস্যুগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে বা তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না
    • ১. হাইপোক্সিক হাইপোক্সিয়া (Hypoxic Hypoxia): যা ফুসফুসে গ্যাস বিনিময়ের সমস্যার কারণে হয় ।
    • ২. অ্যানিমিক হাইপোক্সিয়া (Anemic Hypoxia): যা রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে ঘটে ।
    • ৩. স্ট্যাগন্যান্ট হাইপোক্সিয়া (Stagnant Hypoxia): যা দুর্বল রক্ত সঞ্চালনের কারণে হয় ।
    • ৪. হিস্টোটক্সিক হাইপোক্সিয়া (Histotoxic Hypoxia): যেখানে সেলগুলো অক্সিজেন ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয় ।
  • ঞ. সায়ানোসিস (Cyanosis): হলো ত্বক, ঠোঁট, নখের চারপাশের চামড়া এবং মিউকাস মেমব্রেন-এর নীলচে বা বেগুনি বর্ণ ধারণ করা, যা শরীরের টিস্যুতে অক্সিজেন-এর অভাবের (হাইপোক্সিয়া) একটি প্রধান লক্ষণ ।
  • ট. রেসপিরেটরি ইনসাফিসিয়েন্সি (Respiratory Insufficiency): হলো শ্বসনতন্ত্রের একটি মারাত্মক অবস্থা, যেখানে ফুসফুস (লাঙ) পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন গ্রহণ করতে বা কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করতে ব্যর্থ হয় ।
  • ঠ. কাশি (Cough): ফুসফুস থেকে মুখ দিয়ে সশব্দে বায়ু বের হয়ে আসাকে কাশি বলা হয়।
  • ড. গয়ের বা স্পুটাম (Sputum): কাশির ফলে ফুসফুস থেকে যে শ্লেষ্মা বা কফ বেরিয়ে আসে, তাকে গয়ের (Sputum) বলা হয় ।
  • ঢ. ব্রঙ্কাইটিস (Bronchitis): হলো শ্বাসনালীর শাখা বা ব্রংকাস-এর প্রদাহ (ইনফ্লামেশন)
  • ণ. ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা (Bronchial Asthma): হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ফুসফুসের বায়ু চলাচলের পথগুলো (প্রধানত ব্রংকিওল) সংকুচিত হয়ে যায় ।
  • ত. যক্ষ্মা বা টিউবার কুলোসিস বা টিবি (Tuberculosis - TB): একটি সংক্রামক রোগ যা মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয় ।
  • থ. নিউমোনিয়া (Pneumonia): হলো ফুসফুসের টিস্যুর প্রদাহ
  • দ. লাঙ ক্যান্সার (Lung Cancer): ফুসফুসের ক্যান্সার একটি মারাত্মক রোগ ।

প্লুরা (Pleura)

প্লুরা (Pleura) হলো তন্তুময় থলে আকৃতির অঙ্গ যা লাঙ (ফুসফুস)-কে আবৃত করে রাখে । এটি একটি সেরাস মেমব্রেন যা মেজোথেলিয়াম-এর আবরণ দ্বারা আবৃত । এর প্রধান কাজ ফুসফুসকে আঘাত থেকে রক্ষা করা । সেরাস মেমব্রেন হলো একটি পাতলা আস্তরণ যা বদ্ধ গহ্বর সমূহকে আবৃত করে রাখে ।

প্লুরা-র অংশসমূহ

সাধারণভাবে প্লুরা-র দুইটি অংশ বা স্তর (লেয়ার) রয়েছে, যথা: (ক). পালমোনারি প্লুরা বা ভিসেরাল লেয়ার (স্তর): এটি ফুসফুসের সাথে সংযুক্ত থাকে । (খ). প্যারাইটাল প্লুরা বা প্যারাইটাল লেয়ার (স্তর): এটি বিভিন্ন অঙ্গ বা স্থানের সাথে সম্পর্কিত।

পালমোনারি ও প্যারাইটাল প্লুরা-র মাঝে প্লুরাল ক্যাভিটি নামক একটি গহ্বর (ক্যাভিটি) রয়েছে। পালমোনারি ও প্যারাইটাল প্লুরা-র অভ্যন্তরীণভাগ এপিথেলিয়াম দ্বারা আবৃত । প্লুরাল ক্যাভিটি-তে প্লুরাল ফ্লুইড নামক একটি তরল পদার্থ থাকে যা প্লুরাল এপিথেলিয়াম কর্তৃক নিঃসৃত হয় । এই তরল পদার্থের কাজ হলো প্লুরা-র স্তর সমূহকে ঘর্ষণ থেকে রক্ষা করা ।

ক্লিনিক্যাল

  • ক. প্লুরিসি (Pleurisy): প্লুরা-র ইনফ্ল্যামেশন-কে প্লুরিসি বলা হয় । এর প্রধান কারণ সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন ।
  • খ. প্লুরাল ইফিউশন (Pleural Effusion): হলো প্লুরা-র দুটি স্তরের মাঝে অতিরিক্ত তরল পদার্থ জমে যাওয়ার একটি অবস্থা ।
  • গ. হেমোথোরাক্স (Hemothorax): হলো প্লুরা-র দুটি স্তরের মাঝে রক্ত জমা হওয়া
  • ঘ. নিউমোথোরাক্স (Pneumothorax): হলো প্লুরা-র দুটি স্তরের মাঝে বাতাস জমা হওয়া



Post a Comment

0 Comments